ভারত থেকে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে এসে পৌঁছেছে নতুন ১৮টি ব্রডগেজ রেল কোচ । বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতের রাইটস লিমিটেডের (RITES) সাথে যে ২০০টি কোচ আমদানির চুক্তি হয়েছিল, এটি তারই প্রথম চালান। পূর্ববর্তী সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ধারাবাহিকতায় এই বগি এবং গত বছর উপহার হিসেবে আসা ২০টি ইঞ্জিন বাংলাদেশে এসেছে।
প্রতিটি কোচের গড় আমদানি মূল্য পড়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে একই মানের বগি আনলে উচ্চ শ্রমমূল্য ও জাহাজীকরণ খরচের কারণে দাম পড়তো ১২ থেকে ২০ কোটি টাকা (প্রায় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি)! তাছাড়া ভৌগোলিক কারণে ভারতের পাঞ্জাব থেকে সরাসরি রেললাইন দিয়েই দর্শনা হয়ে এগুলো সহজে চলে এসেছে। বিগত সরকারের আমলে রেল লাইনের যথেষ্ট সম্প্রসারণ হলেও রেল চলাচল ও যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেহারে বাড়েনি। ১৯৪৭ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বৃটিশদের তৈরি করা রেল লাইনের মোট দৈর্ঘ্য ছিল ২৬০৩.৯২ কিলোমিটার। পাকিস্তানের ২৫ বছরে রেললাইন বেড়েছিল ২৫৪.৭৮ কিলোমিটার। স্বাধীনতা উত্তর ১৯৭১ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৩৮ বছরে রেললাইন তো বাড়েইনি বরং রেললাইন কমেছিল ২৩.৭০ কিলোমিটার। রেল লাইনের সম্প্রসারণ বলতে যা হয়েছে সেটা হয়েছে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময় কালে ।এসমেয়ে রেললাইন বেড়েছে ৭৬৫ কিলোমিটার । বর্তমানে বাংলাদেশের রেল লাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৬০০ কিলোমিটার।
রেললাইন সম্প্রসারণের চেয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার বিদ্যমান ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও যাত্রী সেবার মানোন্নয়ন। আমাদের রেলওয়েকে জনবান্ধব করতে ৫টি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:
১. বগি ও ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়ানো: ট্রেনের সংখ্যা পর্যাপ্ত হলে টিকিটের কৃত্রিম সংকট কাটবে এবং টিকিট কালোবাজারি বা চোরাই কারবারি আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে।
২. শূন্যপদে দ্রুত লোকবল নিয়োগ: প্রায় ৪৩% পদ খালি থাকায় কোটি কোটি টাকার নতুন স্টেশন বন্ধ হয়ে আছে। দ্রুত স্টেশন মাস্টার ও কর্মী নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
৩. বিদ্যমান লাইন ও সিগন্যাল মেরামত: পুরোনো রেললাইন ও অ্যানালগ সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন (জিপিএস-ভিত্তিক অটোমেটিক সিগন্যালিং ও ডাবল লাইন) করলে ট্রেনের গতি বাড়বে এবং শিডিউল বিপর্যয় কমবে।
৪. যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি: সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা, ট্রেনের ভেতরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, খাবারের মান উন্নত করা এবং যাত্রীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া।
৫. আধুনিক প্রযুক্তি ও আয় বৃদ্ধি: ট্রেনের লাইভ লোকেশন জানতে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং অ্যাপ চালু করা এবং রেলের আয় বাড়াতে বন্দরগুলোর সাথে আরও বেশি মালবাহী (Freight) ট্রেন চালানো।
নতুন রেললাইনের চেয়ে এই মুহূর্তে ‘Passenger First’ বা যাত্রী সাধারণের সেবাকেই সবার আগে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। রেল হোক নিরাপদ, আরামদায়ক ও আধুনিক।
লেখক: ড. মীজানুর রহমান
প্রফেসর ড. মীজানুর রহমান বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবং পূর্বে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তার মেয়াদের সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়; যার মধ্যে কেরানীগঞ্জে নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের উদ্যোগ অন্যতম। একজন সক্রিয় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লেখেন এবং টিভি টকশোতে মতামত ব্যক্ত করে থাকেন।


