নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলায় দুবাইপ্রবাসী এক ব্যক্তির বাড়ির ঠিকানা জানতে চাওয়ার পর এক যুবককে গুলি করেছে মোটরসাইকেলে আসা দুই মুখোশধারী দুর্বৃত্ত। রোববার (১৮ অক্টোবর) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে উপজেলার মাইলোড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গুলিবিদ্ধ সুজন পাল (৩৩) নামের ওই যুবককে প্রথমে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রামকৃষ্ণ মিশন থেকে প্রায় ১০০ মিটার পূর্বে একটি পুকুরঘাটের পাশের পাকা সড়কে এ ঘটনা ঘটে। সুজন পাল খালিয়াজুরি উপজেলার মেন্দিপুর গ্রামের জিতেন্দ্র পালের ছেলে। তিনি মোহনগঞ্জের ‘মনোরমা মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামের একটি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি উপজেলার মাইলোড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকেন।
প্রবাসীর ঠিকানা জানতে চেয়ে অস্ত্র বের করেন দুর্বৃত্তরা
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, রোববার ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য বাড়ির কাছের একটি পুকুরঘাটে যান সুজন। হাত-মুখ ধোয়া শেষে পাকা সড়কে ওঠার সময় মোটরসাইকেলে করে সেখানে আসে দুই ব্যক্তি। তাঁদের মুখ ঢাকা ছিল।
একপর্যায়ে তাঁরা সুজনের কাছে দুবাইপ্রবাসী পলাশ সাহার বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। কথাবার্তার মধ্যে একজন আগ্নেয়াস্ত্র বের করলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সুজন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন পেছন থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি সড়কের ওপর পড়ে যান।
গুলি চালানোর পর দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল নিয়ে দেওথান কালীমন্দিরের দিকে পালিয়ে যায়। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে তাঁরা আহত সুজনকে উদ্ধার করে মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।
পিঠে গুলি, উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহে পাঠানো
মোহনগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) অলক কান্তি তালুকদার জানান, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সকালে সুজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁর পিঠে গুলি লেগেছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
সুজনের স্ত্রী টুম্পা পাল জানান, তাঁর স্বামী বাড়ির পাশের পুকুরে হাত-পা ধুতে গিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শুনে তিনি বাইরে গিয়ে স্বামীকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
টুম্পা পালের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর স্বামী তাঁকে জানিয়েছেন, পুকুর থেকে হাত-মুখ ধুয়ে সড়কে ওঠার পর মোটরসাইকেলে আসা দুই মুখোশধারী ব্যক্তি তাঁর কাছে এক প্রবাসীর বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। তাঁদের একজন অস্ত্র বের করলে তিনি ভয়ে দৌড় দেন। এ সময় পেছন থেকে তাঁকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্তের চেষ্টা
মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুল ইসলাম জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের মুখ ঢাকা ছিল। আহত সুজন বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর পিঠে গুলি লেগেছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে হামলাকারীদের পরিচয়, হামলার উদ্দেশ্য কিংবা দুবাইপ্রবাসী পলাশ সাহার সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
কয়েক দিনের ব্যবধানে গুলির ঘটনায় উদ্বেগ
নেত্রকোনায় কয়েক দিনের ব্যবধানে দুটি গুলির ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলী ফকির নিহত হন। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মোহনগঞ্জে আরেক ব্যক্তিকে গুলি করার ঘটনা ঘটল।
দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পরপর এমন সহিংসতার ঘটনায় জেলার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
মোহনগঞ্জের এ ঘটনায় হামলাকারীরা কেন দুবাইপ্রবাসী পলাশ সাহার বাড়ির ঠিকানা জানতে চেয়েছিল, সুজনকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল কি না এবং হামলার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, পরিকল্পিত উদ্দেশ্য কিংবা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে স্থানীয় লোকজন। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে পুলিশি তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।



