আইয়ুব বাচ্চুর জীবন নিয়ে সিনেমা চান আসিফ ইকবাল

চট্টগ্রামের রবিন থেকে বাংলা রকসংগীতের গিটারসম্রাট হয়ে ওঠা, সংগীতজীবনের উত্থান-পতন, নিজের ব্যান্ড গঠন, ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা এবং অপূর্ণ স্বপ্ন—সব মিলিয়ে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর জীবন যেন একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমার গল্প। নতুন করে কাহিনি তৈরির প্রয়োজন নেই, তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো যথাযথভাবে সাজাতে পারলেই তৈরি হতে পারে অসাধারণ একটি জীবনীচিত্র। এমনটাই মনে করেন গীতিকবি ও সংগীত প্রযোজক আসিফ ইকবাল।

আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল রোববার সন্ধ্যায় ঢাকার মগবাজারের একটি ভবনে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে তিনি এ অভিমত তুলে ধরেন। চট্টগ্রাম মিউজিশিয়ানস ক্লাব ঢাকা, আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন ও তাঁর বন্ধুমহল যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। সেখানে শিল্পীর সংগীতজীবন, অবদান ও স্মৃতিচারণার পাশাপাশি তাঁকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।

অনুষ্ঠানে আইয়ুব বাচ্চুকে স্মরণ করে আসিফ ইকবাল বলেন, একজন শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন। আইয়ুব বাচ্চুর গানও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষকে আলোড়িত করবে এবং নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাবে। সময়ের সীমা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়াই একজন কালোত্তীর্ণ শিল্পীর পরিচয়। তাঁর মতে, আইয়ুব বাচ্চুর সংগীত ও জীবনদর্শনও সেই স্বীকৃতির দাবিদার।

পরে সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে আইয়ুব বাচ্চুর জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন আসিফ ইকবাল। তাঁর ভাষায়, চট্টগ্রামের রবিন থেকে গিটারসম্রাট হয়ে ওঠার পথটি ছিল নানা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও সাফল্যে ভরা। প্রথম অ্যালবামের ব্যর্থতা, ব্যান্ড সোলস ছেড়ে নিজের সংগীতদল গঠন, ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা এবং জীবনের শেষ অধ্যায়—প্রতিটি পর্বেই রয়েছে দর্শকদের আকৃষ্ট করার মতো উপাদান।

আসিফ ইকবাল বলেন, ২৮ বছর বয়সে নিজের ব্যান্ড গঠন, ১৯৯২ সালে দেশের প্রথম ডাবল অ্যালবাম প্রকাশ, সহশিল্পীদের সঙ্গে মতবিরোধ এবং ৫৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু—এসব ঘটনা একটি জীবনীচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তাঁর মতে, চিত্রনাট্যকারের কাজ হবে ঘটনাগুলোকে যথাযথভাবে বিন্যস্ত করা, যাতে দর্শকেরা একজন শিল্পীর সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর সংগ্রাম, হতাশা ও স্বপ্নের কথাও জানতে পারেন।

আইয়ুব বাচ্চুর সংগীতজীবনের গল্প শুধু জনপ্রিয়তার শিখরে ওঠার কাহিনি নয়। একজন শিল্পী কীভাবে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন, সংগীতের প্রতি দায়বদ্ধতা বজায় রেখে কীভাবে শ্রোতাদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলেন, সেই যাত্রাও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের বিকাশে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে একটি চলচ্চিত্র কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অপূর্ণ দুটি স্বপ্নকে পর্দায় তুলে ধরার সুযোগ

আইয়ুব বাচ্চুর জীবনের দুটি অপূর্ণ স্বপ্নের কথাও তুলে ধরেন আসিফ ইকবাল। এর একটি ছিল ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ১৫ লাখ মানুষের সামনে কনসার্ট করা। অন্যটি ছিল তরুণদের গিটার শেখানোর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

আসিফ ইকবালের মতে, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিশাল দর্শকসমাগমের সামনে কনসার্ট করার স্বপ্নটি কল্পনাভিত্তিক দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তুলে ধরা সম্ভব। আর তরুণদের গিটার শেখানোর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্নটি বাস্তবে রূপ দিতে চলচ্চিত্র নির্মাণকে কেন্দ্র করে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

এই ভাবনার গুরুত্ব কেবল একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইয়ুব বাচ্চুর মতো একজন সংগীতসাধকের নামে তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংগীতচর্চায়ও তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংগীতাঙ্গনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

অপ্রকাশিত গান হতে পারে চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ

আইয়ুব বাচ্চুর অপ্রকাশিত গানগুলোর কথাও উল্লেখ করেন আসিফ ইকবাল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এবি ফাউন্ডেশনের হাতে শিল্পীর প্রায় ২০০টি গান রয়েছে, যেগুলো পর্যায়ক্রমে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব গান চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

একজন শিল্পীর জীবনীচিত্রে তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর পাশাপাশি অপ্রকাশিত সৃষ্টির ব্যবহার দর্শকদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব গানের সঙ্গে শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সংগীতচিন্তা কিংবা সৃজনশীল জীবনের কোনো বিশেষ অধ্যায়ের যোগসূত্র রয়েছে, সেগুলো যথাযথ প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা গেলে চলচ্চিত্রের আবেদন আরও বাড়তে পারে।

তবে গান ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বত্ব, অনুমতি ও প্রকাশসংক্রান্ত বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রকাশিত গানগুলো চলচ্চিত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেগুলোর সংগীতায়োজন, প্রেক্ষাপট এবং শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে আইয়ুব বাচ্চুর জীবন ও সংগীত

বাংলাদেশে সংগীতশিল্পীদের জীবন নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য জীবনীচিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে আসিফ ইকবাল বলেন, দেশে রাজনীতিকদের জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও সংগীতশিল্পীদের জীবন নিয়ে এমন উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাঁর মতে, আইয়ুব বাচ্চুর জীবন নিয়ে সিনেমা নির্মিত হলে সংগীত, সংগ্রাম ও স্বপ্নের গল্প একসঙ্গে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে অনেক তরুণ আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘রুপালি গিটার’-এর সঙ্গে পরিচিত। তবে একটি গান শোনার অভিজ্ঞতা আর সেই গানের স্রষ্টার জীবন, শিল্পী হয়ে ওঠার পেছনের সংগ্রাম এবং সংগীতজগতের নানা বাঁক সম্পর্কে জানা এক বিষয় নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র এই ব্যবধান কমাতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংগীতভিত্তিক জীবনীচিত্র ‘বোহেমিয়ান র‍্যাপসোডি’র উদাহরণ টানেন আসিফ ইকবাল। তাঁর মতে, এ ধরনের চলচ্চিত্রের বিশেষত্ব হলো, দর্শকেরা অনেক সময় শিল্পীর গান আগে থেকেই চেনেন। ফলে পরিচিত সুরের সঙ্গে শিল্পীর জীবনের অজানা অধ্যায় যুক্ত হলে তা দর্শকের আবেগকে আরও গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। আইয়ুব বাচ্চুর ক্ষেত্রেও তাঁর জনপ্রিয় গান, মঞ্চে পরিবেশনার অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা অধ্যায় চলচ্চিত্রের শক্তিশালী উপাদান হয়ে উঠতে পারে।

ব্যক্তিগত স্মৃতিতে আইয়ুব বাচ্চু

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাও স্মরণ করেন আসিফ ইকবাল। তিনি জানান, তাঁর লেখা ‘১০০টা স্বপ্ন’ গানটি গেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। সেই স্মৃতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি শিল্পীর অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পর্দায় তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, যিনি অন্যের লেখা গানে নিজের কণ্ঠ ও সুরের জাদু ছড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁর নিজের জীবনের গল্পও একদিন দর্শকদের সামনে আসা উচিত।

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে তাঁর শারীরিক উপস্থিতির অবসান ঘটেছে, কিন্তু সংগীতের মধ্য দিয়ে তাঁর সঙ্গে শ্রোতাদের সম্পর্ক এখনো অটুট। তাঁর গান যেমন একসময়কার শ্রোতাদের স্মৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি নতুন প্রজন্মও সেসব গানের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে।

আসিফ ইকবালের মতে, একজন শিল্পীকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হলো তাঁর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সময়ের সঙ্গে শ্রোতা বদলাবে, নতুন মাধ্যম আসবে, সংগীত শোনার ধরনও পাল্টাবে। কিন্তু শিল্পীর সৃষ্টি যদি মানুষের অনুভূতিকে স্পর্শ করতে পারে, তবে তা টিকে থাকবে।

আইয়ুব বাচ্চুর জীবন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাবনাটি তাই কেবল স্মৃতিচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাস তুলে ধরা, তরুণদের সংগীতচর্চায় উৎসাহিত করা এবং একজন শিল্পীর অপূর্ণ স্বপ্নগুলো নতুনভাবে সামনে আনার সম্ভাবনা। আসিফ ইকবালের প্রত্যাশা, একদিন আইয়ুব বাচ্চুর জীবন ও সংগীতের এই গল্প পর্দায় ফুটে উঠবে, আর তাঁর পরিচিত গানের আড়ালে থাকা মানুষটিকেও নতুন করে চিনবে দর্শক।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।