সৌদিতে নজরুলের শিরশ্ছেদের খবর, শোক সইতে না পেরে ফুফুর মৃত্যু

সৌদি আরবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার যুবক নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সইতে না পেরে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নজরুলের বাবা-মা। বিদেশে ছেলেকে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন বাবা আবদুল বাছির। এখন ছেলেকে হারানোর শোকের পাশাপাশি সেই ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

নজরুল ইসলামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করে স্বচ্ছলতার মুখ দেখার আশায় ২০২২ সালে তাঁকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের সেই আশা পূরণ হওয়ার আগেই এসেছে তাঁর মৃত্যুর খবর।

স্বজনদের দাবি, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর তাঁরা জানতে পারেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকেই প্রথম বিষয়টি জানতে পেরেছেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। এই খবর জানার পরই তাঁদের পরিবারে নেমে আসে শোকের মাতম। স্বজনদের ভাষ্য, প্রিয় ভাতিজার মৃত্যুসংবাদ সহ্য করতে না পেরে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আবেদা বেগম।

ঋণ করে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল নজরুলকে

পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে নজরুলকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তাঁর বাবা-মা। এ জন্য সাত লাখ টাকা ঋণ করেন আবদুল বাছির। ২০২২ সালে সৌদি আরবে যাওয়ার পর মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন নজরুল।

পরিবারের সদস্যদের আশা ছিল, বিদেশে কাজ করে নজরুল নিয়মিত অর্থ পাঠাবেন। সেই আয় দিয়ে সংসারের অভাব দূর হবে, ঋণের বোঝাও ধীরে ধীরে কমে আসবে। কিন্তু সৌদি আরবে যাওয়ার সাত-আট মাস পর থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

স্বজনেরা জানান, দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পাওয়ার পর একসময় কারাগার থেকে ফোন করে নজরুল তাঁদের জানান, তিনি বন্দি রয়েছেন। তবে কী কারণে তাঁকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। এরপর থেকে তাঁর কারাবাস, মামলার অগ্রগতি কিংবা আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিবার স্পষ্ট কোনো তথ্য পেয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে তাঁকে কোন মামলায় দণ্ডিত করা হয়েছিল, মামলার বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং দণ্ড কার্যকরের আগে তাঁর আপিলের সুযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ে পরিবারের বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

‘ছেলেও গেল, বোনও গেল’

নজরুলের মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন তাঁর বাবা আবদুল বাছির। ছেলেকে হারানোর পাশাপাশি বোনের মৃত্যুও তাঁকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলেছে। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

আবদুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলেও গেল, বোনও গেল। সব হারিয়ে আমি এখন নিঃস্ব। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে সাত লাখ টাকা ঋণ করেছিলাম। এখন কীভাবে এই ঋণ শোধ করব, তাও জানি না। সরকারের কাছে দাবি, আমার ছেলের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।’

ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে যথাযথ আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কারাগারে থাকার সময় নজরুল তাঁকে জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তবে পরিবারের এই বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কনস্যুলেটের সঙ্গে নজরুলের যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল কি না কিংবা তাঁর মামলায় কোনো ধরনের কূটনৈতিক বা আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

আইনি সহায়তা ও কনস্যুলেটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বিদেশে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর মামলার বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সহায়তা সম্পর্কে পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আপিলের অধিকার এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী অন্যান্য প্রতিকার গ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে নজরুলের মামলার প্রকৃতি, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, আদালতের রায় কিংবা দণ্ড কার্যকরের আগে তিনি কী ধরনের আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন—এসব তথ্য জানা না থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি সৌদি আরবে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা কনস্যুলেটের বক্তব্য এবং মামলার নথি যাচাই করা প্রয়োজন।

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় দেশ ছাড়েন। তাঁদের কারও কারও পেছনে থাকে ঋণ, জমি বিক্রি কিংবা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে নেওয়া ধার করা অর্থ। ফলে বিদেশে কর্মরত কোনো ব্যক্তি গুরুতর আইনি জটিলতায় পড়লে তাঁর পরিবারের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ একসঙ্গে নেমে আসে। নজরুলের পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই সংকটের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

মরদেহ ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় পরিবার

নজরুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিরামপুর গ্রামজুড়ে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্বজন ও এলাকাবাসী শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে তাঁদের বাড়িতে ভিড় করছেন। পরিবারের সদস্যদের এখন প্রধান চাওয়া, নজরুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে যথাযথভাবে দাফনের ব্যবস্থা করা।

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। মরদেহ দেশে ফিরলে পরিবারকে সহায়তা করা হবে।

এদিকে ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের পর থেকে একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পরিবার। কী অভিযোগে নজরুলকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, কারাগারে থাকার সময় তিনি পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশি কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না—এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য চান স্বজনেরা।

একদিকে প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় শোক, অন্যদিকে ঋণের বোঝা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে বিপর্যস্ত নজরুলের পরিবার। তাঁদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নজরুলের আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার যোগাযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে পরিবারের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।