কিছু মানুষ জন্ম নেন এক দেশে, কিন্তু তাঁদের হৃদয়জুড়ে থাকে অন্য একটি দেশের মানুষ। জন্মভূমির সীমানা পেরিয়ে তাঁরা ভালোবাসা, মানবতা, শিক্ষা ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন একটি জাতির আপনজন। ইতালিতে জন্ম নেওয়া তেমনই এক মহৎপ্রাণ মানুষ ছিলেন ফাদার মারিনো রিগন—বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম বিদেশি বন্ধু, মানবসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এবং এ দেশের মানুষের পরম সুহৃদ।
ফাদার মারিনো রিগন শুধু একজন খ্রিষ্টধর্মযাজক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানবতার সাধক, শিক্ষার প্রসারে নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবক এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক অকৃত্রিম সমর্থক।
জন্ম ও শৈশব
ফাদার মারিনো রিগনের জন্ম ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভেনেতো প্রদেশের ভিসেঞ্জা জেলার ভিল্লাভেরলা গ্রামে। তাঁর বাবা রিকার্ডো রিগন ছিলেন ইতালির একটি নাট্যদলের অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় অভিনেতা এবং মা মনিকা জোক্কে ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষিকা। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার মূল্যবোধ ধারণ করেছিলেন।
ধর্মীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি মানুষের সেবা ও কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেন। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন তিনি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এ ভূখণ্ডের মানুষ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মার এমন বন্ধন গড়ে ওঠে যে বাংলাদেশই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান ঠিকানা।
শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান
বাংলাদেশে এসে ফাদার রিগন তাঁর কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহলাবুনিয়া গ্রামে। টানা প্রায় ৬৩ বছর এ দেশের মানুষের পাশে থেকে তিনি শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেন।
বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলেন ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল কেবল প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; শিক্ষা ছিল দারিদ্র্য, অজ্ঞতা ও পশ্চাৎপদতার অন্ধকার দূর করে মানুষকে আলোকিত করার শক্তি।
ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের বিভেদ নয়—মানুষের প্রয়োজন ও কল্যাণকেই তিনি তাঁর কর্মের প্রধান বিবেচনা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বহু মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়েছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ফাদার মারিনো রিগনের মানবিক অবস্থান তাঁকে এ দেশের মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের সেই ভয়াবহ সময়ে তিনি নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ান। মুক্তিযুদ্ধের বিপন্ন মানুষের জন্য তাঁর সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও মানবিক ভূমিকা ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।
নিজের জন্মভূমি ইতালির মানুষ হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের দুঃখ-কষ্টকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন। ভাষা, ধর্ম কিংবা জাতীয়তার পার্থক্য তাঁর মানবিক দায়িত্ববোধকে কখনো সীমাবদ্ধ করতে পারেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসে বিদেশি বন্ধুদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ফাদার রিগন তাঁদের মধ্যে এমন একজন, যিনি কথায় নয়, কর্মে প্রমাণ করেছিলেন—মানবতার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই, মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর জন্য একই ভাষায় কথা বলা কিংবা একই ধর্মে বিশ্বাসী হওয়া অপরিহার্য নয়।
বাংলাদেশের মাটিতে চিরনিদ্রার আকাঙ্ক্ষা
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের পর বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর, ৯২ বছর বয়সে ইতালিতে মৃত্যুবরণ করেন ফাদার মারিনো রিগন।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল এত গভীর যে মৃত্যুর পরও তিনি এ দেশের মাটিতে ফিরে আসতে চেয়েছিলেন। তাঁর শেষ ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় ইতালি থেকে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয়। পরে মোংলার সাধুপালের ক্যাথলিক মিশনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
এ যেন এক আত্মার আপন ঠিকানায় প্রত্যাবর্তন—যে মাটির মানুষের জন্য তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় উৎসর্গ করেছিলেন, সেই মাটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল তাঁর চিরনিদ্রার স্থান।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও চিরন্তন উত্তরাধিকার
বাংলাদেশের শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে ফাদার মারিনো রিগনকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করে। এ স্বীকৃতি ছিল বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অবদানের রাষ্ট্রীয় সম্মান।
ফাদার রিগনের জীবন আমাদের শেখায়—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর জন্মপরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জাতীয়তায় সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর কর্মে, তাঁর মানবিকতায় এবং অন্যের জন্য তিনি কতটুকু ভালোবাসা রেখে যেতে পেরেছেন, তার মধ্যে নিহিত।
তিনি ইতালিতে জন্মেছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। তাঁর গড়ে তোলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধের দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি এবং বাংলাদেশের মাটিতে শায়িত থাকার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে আমাদের ইতিহাসের এক অনন্য মানবিক চরিত্রে পরিণত করেছে।
ফাদার মারিনো রিগন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—দেশপ্রেম শুধু জন্মভূমিকে ভালোবাসার নাম নয়; অন্য একটি দেশের মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করাও মানবতার এক অনন্য মহিমা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের এই অকৃত্রিম বিদেশি বন্ধু, শিক্ষানুরাগী ও মানবদরদি মানুষটির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
আপনি জন্মেছিলেন ইতালিতে, কিন্তু আপনার ভালোবাসার ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের হৃদয়ে আপনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
বিনম্র শ্রদ্ধা, ফাদার মারিনো রিগন।


