“হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো—পার করো আমারে”
কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের অমর এই গানের সুরে মিশে আছে জীবনের গোধূলিবেলার আকুতি, অসহায়ত্ব আর পরপারের পথে পাড়ি দেওয়ার এক গভীর মিনতি। এই গান যিনি কণ্ঠে ধারণ করে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই গুণী অভিনেতা ও কণ্ঠশিল্পী অনিল দাস আজ কালের গর্ভে অনেকটাই বিস্মৃত। অথচ মঞ্চনাটক, যাত্রাপালা ও লোকসংগীতের জগতে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকার দাবি রাখে।
১৯৬১ সাল। কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী মোহিনী মিলস অডিটোরিয়ামে মঞ্চস্থ হচ্ছিল যাত্রাপালা পলাশীর পরে। দর্শকসারিতে বসে যাত্রাপালা উপভোগ করছিলেন মোহিনী মিলসের পরিচালক দেবী প্রসাদ চক্রবর্তী, যিনি কানু বাবু নামেই পরিচিত ছিলেন। পালার একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন কুমারখালির সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ অনিল কুমার দাস। তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে কানু বাবু তাঁকে মোহিনী মিলে চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
সেই থেকে ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মোহিনী মিলে চাকরি করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিবেদিত রাখেন অনিল দাস। জীবিকার প্রয়োজনে কর্মজীবনে যুক্ত থাকলেও শিল্পের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি। মঞ্চে যাত্রাপালা ও নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব পরিচিতি। বিশেষ করে লোকসাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের গান পরিবেশন করে তিনি শ্রোতাদের প্রশংসা অর্জন করেন।
কাঙাল হরিনাথের গানকে বৃহত্তর শ্রোতৃসমাজের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনিল দাসের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘আদি অকৃত্রিম’ অনুষ্ঠানে তিনি প্রথমবারের মতো কাঙাল হরিনাথের লেখা ‘শূন্য ঘরে একটি কমল আছে কি সুন্দর’ গানটি পরিবেশন করেন। পরবর্তী সময়ে, ২০১০ সালের ২০ জুলাই কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিটিভির একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠে পরিবেশিত হয় কালজয়ী গান ‘হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে’। লোকসংগীতের এই অমূল্য সৃষ্টি তাঁর কণ্ঠে নতুন করে শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।
কুষ্টিয়ার পরিমল থিয়েটার এবং কুমারখালির রূপালী সাংস্কৃতিক সংঘের সক্রিয় সদস্য হিসেবে অনিল দাস দীর্ঘদিন সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করেছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মঞ্চে অভিনয় করেছেন দুই শতাধিক যাত্রাপালা ও তিন শতাধিক নাটকে। সংখ্যার বিচারে এই অভিনয়যাত্রা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি গ্রামবাংলার যাত্রা ও নাটকের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর নিরলস শ্রমও ছিল প্রশংসনীয়।
১৯৬৯ সালে তিনি এক বছর প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক সুবল দাসের সহকারী হিসেবেও কাজ করেন। অভিনয় ও সংগীত—দুই ধারাতেই তাঁর বিচরণ প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক শিল্পী।
১৯৩৬ সালে কুমারখালি পৌর এলাকার কাজীপাড়া আদিবাসী পল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন অনিল কুমার দাস। শৈশবেই বাবাকে হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। আর্থিক প্রতিকূলতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথও দীর্ঘ হয়নি। কুমারখালি জেএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেই থেমে যেতে হয়। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তাঁর প্রতিভার বিকাশকে আটকে রাখতে পারেনি। কিশোর বয়সে ‘শ্রীকৃষ্ণ যমুনা’ যাত্রাপালায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীজীবনের সূচনা। সেই শুরু, তারপর দীর্ঘ পথচলা—মঞ্চের আলোয়, যাত্রার সংলাপে, নাটকের চরিত্রে আর লোকগানের সুরে।
ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী জ্যোৎস্না দাস ও ছেলে শ্যামল দাসকে নিয়ে কুমারখালির আদিবাসী পল্লিতে নিজের বাড়িতে বসবাস করতেন তিনি। তাঁর তিন মেয়ে—তৃষ্ণা দাস, কৃষ্ণা দাস ও শান্তনা দাস; তাঁরা সবাই বিবাহিত। ছোট মেয়ের স্বামী প্রবীর কুমার দাস বাংলাদেশ বেতারের নিয়মিত তবলা বাদক এবং ছায়ানটের তবলা শিক্ষক।
১৯৭৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি কুমারখালি পৌরসভায় চাকরি করেন। জীবিকার তাগিদে চাকরি করলেও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক কখনো ছিন্ন করেননি। শিল্পের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে কুমারখালি থিয়েটার তাঁকে পদক প্রদান করে। জীবনের শেষ পর্যায়ে আর্থিক অনটনে দিন কাটানো এই শিল্পী সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় থেকে নিয়মিত ভাতা পেতেন। তাঁর জীবন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন শিল্পী মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকতে পারেন, অথচ জীবদ্দশায় তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও সচ্ছলতা অনেক সময় অধরাই থেকে যায়।
২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর কুমারখালির আদিবাসী পল্লিতে নিজের বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন অভিনেতা ও কণ্ঠশিল্পী অনিল দাস। আজ তাঁর প্রয়াণের স্মৃতিদিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই নিভৃতচারী শিল্পীকে, যিনি নিজের শ্রম, মেধা ও ভালোবাসা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছিলেন বাংলার যাত্রাপালা, মঞ্চনাটক ও লোকসংগীতের ভুবন।
জীবনের গোধূলিবেলায় তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল—‘হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো, পার করো আমারে।’ আজ তিনি নিজেই পাড়ি দিয়েছেন না-ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁর অভিনীত অসংখ্য চরিত্র, মঞ্চের স্মৃতি আর কণ্ঠে ধারণ করা কাঙাল হরিনাথের অমর গান আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকার কথা।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সময়ের প্রবাহে এমন অনেক গুণী শিল্পী বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যান। তাঁদের অবদান সংরক্ষণ করা, তাঁদের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। অনিল দাসের মতো শিল্পীদের স্মরণ করা মানে শুধু একজন মানুষকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, মঞ্চশিল্প এবং শিকড়ের সংগীত-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, শিল্পী অনিল দাস।
আপনার কণ্ঠের গান বেঁচে থাকুক মানুষের হৃদয়ে, আপনার শিল্পীসত্তা ফিরে আসুক নতুন প্রজন্মের স্মরণে। জীবনের মঞ্চে আপনার অভিনয় শেষ হয়েছে, কিন্তু বাংলার সংস্কৃতির ইতিহাসে আপনার অবদান বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যাক।


