মাগুরায় যুবদল নেতার মৃত্যু, মাথায় গুলির ক্ষত সন্দেহ

মাগুরা পৌরসভার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে বাস কাউন্টারে দায়িত্ব পালনকালে শাকের হোসেন (৩৯) নামের এক যুবদল নেতার মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে পারনান্দুয়ালী টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে তাঁকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রথমে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। তবে দাফনের আগে মরদেহ গোসল করানোর প্রস্তুতির সময় মাথার পেছনে একটি ছিদ্র বা ক্ষতচিহ্ন দেখতে পান তাঁরা। এরপরই মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরিবারের অভিযোগ, শাকের হোসেনকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

তবে তাঁর মাথার পেছনের ক্ষতটি আগ্নেয়াস্ত্রের গুলির কারণে হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেননি চিকিৎসকেরা। পুলিশও ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে নিশ্চিত করেনি। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

শাকের হোসেন মাগুরা পৌরসভার পারনান্দুয়ালী এলাকার ব্যাপারীপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর বাবার নাম মৃত কুতুবউদ্দিন। তিনি মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রয়েল পরিবহনের কাউন্টারে তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে কাউন্টার মাস্টার হিসেবে কাজ করেছেন।

পরিবারের সদস্যদের কাছে ঘটনাটি আরও রহস্যজনক হয়ে ওঠে মাথার পেছনে ক্ষতচিহ্ন পাওয়ার পর। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমবার হাসপাতালে নেওয়ার সময় শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। সে কারণে প্রাথমিকভাবে স্ট্রোক বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয়। দাফনের আগে গোসল করানোর প্রস্তুতির সময় মাথার পেছনে ক্ষতটি চোখে পড়লে তাঁরা দ্রুত বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানান এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য আবার মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যান।

মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক খন্দকার মাইনুল হাসান জানান, মরদেহের মাথার চুল কামিয়ে পরীক্ষা করার পর সেখানে একটি ছিদ্রকারী বা ভেতরে প্রবেশকারী ক্ষত পাওয়া গেছে। তবে ক্ষতটি গুলির কারণে হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণে সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলা সম্ভব নয়।

চিকিৎসক বলেন, এ ধরনের ক্ষতের প্রকৃতি ও মৃত্যুর সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ধারণে ফরেনসিক পরীক্ষা প্রয়োজন। ঘটনাটি এখন পুলিশের তদন্তাধীন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যাবে।

শাকের হোসেনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর আত্মীয় ও মাগুরা জেলা বিএনপির সদস্য মো. কুতুবউদ্দিন। তাঁর দাবি, ঘটনার সময় টার্মিনালে উপস্থিত কয়েকজনের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পেরেছেন, একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন ব্যক্তি সেখানে এসেছিলেন। ওই সময় মোটরসাইকেলের সাইলেন্সার থেকে জোরে শব্দ করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে তিনি উল্লেখ করেন। একজন যাত্রী গুলির শব্দ শুনেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

কুতুবউদ্দিনের আরও অভিযোগ, কাউন্টারে শাকের হোসেন যেখানে বসে কাজ করতেন, সেখানে টেবিলের ওপর এবং নিচে মেঝেতে রক্তের ছোপ দেখা গেছে। তাঁর মতে, এসব বিষয় ঘটনাটিকে সন্দেহজনক করে তুলেছে। তবে মোটরসাইকেলে আসা ব্যক্তিদের পরিচয়, তাঁদের সঙ্গে শাকের হোসেনের কোনো বিরোধ ছিল কি না কিংবা তাঁরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিবারের অভিযোগ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

ঘটনার খবর পেয়ে বুধবার সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এটি হত্যাকাণ্ড কি না, তা এই মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পুলিশ ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থল ঘিরে রেখে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। সব দিক বিবেচনায় রেখেই তদন্ত চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।

এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পরীক্ষা, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাথার ক্ষত, কাউন্টারে রক্তের চিহ্ন এবং গুলির শব্দ শোনার দাবি—প্রতিটি বিষয়ই তদন্তকারীদের কাছে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে কোনো একটি আলামত বা অভিযোগের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

শাকের হোসেনের মৃত্যু ঘিরে স্থানীয় পরিবহনশ্রমিক, রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একই কাউন্টারে কাজ করা একজন কর্মীর আকস্মিক মৃত্যু এবং পরে মরদেহে ক্ষতচিহ্ন আবিষ্কারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো, শাকের হোসেনের মৃত্যু অসুস্থতাজনিত, দুর্ঘটনাজনিত, নাকি কোনো অপরাধের ফল—তা নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এবং পুলিশের তদন্তের অগ্রগতিই এ ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার করতে পারে। ততক্ষণ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।