স্মরণে বিপ্লবী নারী লীলা নাগ রায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী, নারী জাগরণের অগ্রদূত ও নেতাজির স্নেহধন্যা অগ্নিকন্যা লীলা নাগ রায়।

“আপনার বন্ধুকে নিয়ে আপনাকে একটি কথা জানাতে চাই… তিনি জীবিত আছেন, ভারতেই আছেন।”

“I wanted to tell you something about your friend… He is alive in India.”

ইতিহাসের পাতায় কখনো কখনো এমন কিছু বাক্য লেখা থাকে, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। তেমনই একটি বাক্য লিখেছিলেন বিপ্লবী লীলা নাগ রায়। ১৯৬৩ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু দিলীপ রায়কে লেখা একটি চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর সেই বন্ধু জীবিত এবং ভারতেই রয়েছেন। এই চিঠিকে কেন্দ্র করে নেতাজির অন্তর্ধান-রহস্য নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়।

কিন্তু কে ছিলেন এই লীলা নাগ রায়? শুধু নেতাজির ঘনিষ্ঠজন হিসেবেই কি তাঁকে স্মরণ করা হবে? নাকি তাঁর নিজের সংগ্রাম, সাহস, আত্মত্যাগ এবং নারীশিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদানের জন্যও তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করা আমাদের দায়িত্ব?

ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, লীলা নাগ ছিলেন একাধারে বিপ্লবী, শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক, সাংবাদিক ও নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর জীবন ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

শিক্ষার আলোয় নতুন পথের সন্ধান

লীলা নাগের জন্ম ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর। তাঁর জন্মস্থান নিয়ে বিভিন্ন জীবনীতে কিছু পার্থক্য থাকলেও তিনি তৎকালীন আসাম অঞ্চলের গোয়ালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। শিক্ষাজীবনে অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়ে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ পদ্মাবতী স্বর্ণপদক লাভ করেন।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশ ও নারীদের উচ্চশিক্ষার সীমাবদ্ধতার মধ্যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ অর্জন করেন। তিনিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। পরবর্তী সময়ে এখান থেকেই ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর এই অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না; এটি ছিল বাঙালি নারীর উচ্চশিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এক সাহসী পদক্ষেপ। যে সময়ে নারীর শিক্ষালাভকেও অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক বাধার মুখোমুখি হতে হতো, সে সময়ে লীলা নাগ নিজের পথ তৈরি করে অন্য নারীদের জন্যও সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন।

নারী জাগরণ ও বিপ্লবের অগ্নিশিখা

লীলা নাগ বিশ্বাস করতেন, নারীর মুক্তি ছাড়া সমাজের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। এই বিশ্বাস থেকেই ১৯২৩ সালে ঢাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দীপালি সংঘ’। নারীদের শিক্ষা, আত্মনির্ভরতা, শারীরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তোলাই ছিল এই সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য।

দীপালি সংঘের মাধ্যমে নারীদের সংগঠিত করা, আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সমাজের প্রচলিত বাধা অতিক্রমে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের মতো বিপ্লবীরাও এই সংগঠনের প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন।

নারীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে তিনি ঢাকায় একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল কেবল জীবিকা অর্জনের উপায় নয়; শিক্ষা ছিল আত্মমর্যাদা, স্বাধীন চিন্তা ও সামাজিক মুক্তির হাতিয়ার।

১৯৩১ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা। নারী লেখকদের সাহিত্যচর্চা ও চিন্তার প্রকাশের জন্য এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পত্রিকাটির নামকরণেও আশীর্বাদপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে জানা যায়।

নেতাজির সঙ্গে পরিচয় ও রাজনৈতিক পথচলা

১৯২১ সালের বাংলার বন্যায় ত্রাণকার্য পরিচালনার সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে লীলা নাগের পরিচয় ঘটে বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তাঁদের সম্পর্কের সূত্রপাত, যা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহযাত্রা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় গভীরতা লাভ করে।

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে গিয়ে লীলা নাগ কারাবরণ করেন। তাঁর জীবন ছিল নিছক রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি সংগঠন গড়েছেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং নারীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলধারায় যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।

১৯৩৮ সালে নেতাজি যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি, তখন তিনি লীলা নাগকে কংগ্রেসের জাতীয় পরিকল্পনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে নেতাজি কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করলে লীলা নাগ ও তাঁর স্বামী অনিল চন্দ্র রায়ও সেই রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত হন।

দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক হিংসা ও উদ্বাস্তু সংকটের মধ্যেও লীলা নাগ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বিশেষত পূর্ববঙ্গ থেকে বাস্তুচ্যুত অসহায় মানুষ এবং নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে তাঁর ভূমিকা ছিল মানবিক দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

নেতাজির অন্তর্ধান-রহস্যে লীলা নাগের সেই চিঠি

লীলা নাগের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান-রহস্য।

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর যে প্রচলিত বিবরণ রয়েছে, তা নিয়ে বহু দশক ধরে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও বিকল্প তত্ত্ব সামনে এসেছে। এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলো উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে ‘ভগবানজী’ বা ‘গুমনামি বাবা’ নামে পরিচিত এক রহস্যময় সন্ন্যাসীকে ঘিরে প্রচলিত দাবি।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লীলা নাগ দিলীপ রায়কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন—

“I wanted to tell you something about your friend. He is alive; in India.”

অর্থাৎ, ‘আপনার বন্ধুকে নিয়ে আপনাকে একটি কথা জানাতে চাই। তিনি জীবিত আছেন, ভারতেই আছেন।’

এই চিঠির বক্তব্যকে নেতাজি জীবিত থাকার দাবির সমর্থকেরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তাঁদের মতে, লীলা নাগের মতো নেতাজির ঘনিষ্ঠজনের এমন বক্তব্য উপেক্ষা করার মতো নয়। তবে চিঠিটির প্রেক্ষাপট, ‘বন্ধু’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে এবং এর বক্তব্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণের জন্য নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রামাণ্য গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

ফৈজাবাদের রাম ভবনে ভগবানজীর ব্যবহৃত সামগ্রীর মধ্যে লীলা নাগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু চিঠিপত্র পাওয়া ৭গিয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে একটি চিঠিতে ‘লী’ বলে সম্বোধনের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। নেতাজি লীলা নাগকে ‘লী’ নামে ডাকতেন—এই তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে অনেকে চিঠিটিকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন।

আরও দাবি করা হয়েছে, হস্তলিপি বিশেষজ্ঞ বি. লাল নেতাজির লেখা ও ভগবানজীর লেখা কিছু নথির তুলনা করে সাদৃশ্য পেয়েছিলেন। তবে এই দাবি থেকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না যে ভগবানজীই নেতাজি ছিলেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন মত, নথি ও মূল্যায়ন রয়েছে; তাই প্রমাণিত ইতিহাস এবং বিতর্কিত অনুমানকে পৃথকভাবে বিবেচনা করাই যুক্তিসংগত।

তবু লীলা নাগের চিঠি ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। এটি নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে মানুষের দীর্ঘদিনের কৌতূহলকে আরও গভীর করেছে এবং ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

শেষ অধ্যায়, অমর উত্তরাধিকার

১৯৭০ সালের ১১ জুন কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন লীলা নাগ রায়। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় উপমহাদেশ হারায় এক সাহসী স্বাধীনতা সংগ্রামী, নারীশিক্ষার অগ্রদূত এবং মানবমুক্তির স্বপ্নে নিবেদিত এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে।

আজ তাঁর নাম স্মরণ করার অর্থ কেবল নেতাজির অন্তর্ধান-রহস্যের একটি অধ্যায় পুনরাবৃত্তি করা নয়। এর অর্থ এমন এক নারীর জীবন ও কর্মকে নতুন করে আবিষ্কার করা, যিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাধা অতিক্রম করে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছিলেন, নারীদের সংগঠিত করেছিলেন, বিপ্লবী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁর পথচলা, দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠা, ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার সম্পাদনা, স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং দেশভাগের বিপর্যয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে লীলা নাগ রায় আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

লীলা নাগ রায় আমাদের শেখান—সাহস মানে শুধু শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়; সাহস মানে সমাজের অন্যায় প্রথাকে প্রশ্ন করা, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের মুক্তির স্বপ্নকে জীবনের ব্রত করে নেওয়া।

নেতাজি জীবিত ছিলেন কি না, ভগবানজী কে ছিলেন—ইতিহাসের এই প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু লীলা নাগের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও নারী জাগরণে অবদান নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।

বিস্মৃতির ধুলো সরিয়ে এই মহীয়সী বিপ্লবীর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হোক। তাঁর সাহস, দেশপ্রেম ও মানবিক আদর্শ আমাদের পথ দেখাক।

বিপ্লবী লীলা নাগ রায়ের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।