সাইবার হামলার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ওয়েবসাইট বন্ধ

বিশ্বের বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট পরিচালনায় ব্যবহৃত জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার খবরে আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা অঙ্গনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা কোনো পাসওয়ার্ড ছাড়াই সংশ্লিষ্ট সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি সংস্থা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় পিএইচপির নির্মাতারা জরুরি সফটওয়্যার সংশোধনী প্রকাশ করেছেন। সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও সার্ভার পরিচালনাকারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংশোধনী স্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দুর্বল সংস্করণের সফটওয়্যার ব্যবহার অব্যাহত থাকলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার, প্রশাসনিক নথি এবং অনলাইন সেবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

পিএইচপি বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত সার্ভারভিত্তিক প্রোগ্রামিং ভাষা। সরকারি সেবামূলক ওয়েবসাইট, সংবাদমাধ্যম, অনলাইন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন তথ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামোতে এটি ব্যবহৃত হয়। ফলে এর নিরাপত্তায় বড় ধরনের দুর্বলতা দেখা দিলে একযোগে বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ক্লাউড নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজের হিসাবে, ইন্টারনেটের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে, সম্প্রতি শনাক্ত হওয়া দুর্বলতা দুটি পিএইচপির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকিগুলোর অন্যতম।

পিএইচপি ফাউন্ডেশনের নিরাপত্তা প্রকৌশলী ভলকার ডুশের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে পিএইচপিকে কেন্দ্র করে এত বড় নিরাপত্তা সংকট দেখা যায়নি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে তিনি ২০১৪ সালের আলোচিত হার্টব্লিড নিরাপত্তা ত্রুটির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।

হার্টব্লিড দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানকে জরুরি ভিত্তিতে তাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা হালনাগাদ করতে হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও দ্রুত সংশোধনী প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএর পক্ষ থেকেও জরুরি সতর্কতার কথা জানানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত নির্দেশনার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবিলম্বে সফটওয়্যার হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।

যেসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা সংশোধনী স্থাপন করা সম্ভব নয়, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা সার্ভারের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ও তথ্যভান্ডারে অননুমোদিত প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, গত আগস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় পিএইচপির উৎসসংকেত পরীক্ষা করার সময় প্রথম নিরাপত্তা দুর্বলতাগুলো শনাক্ত হয়। ক্যালিফ নামের একটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের অর্থায়নে পরিচালিত পরীক্ষায় ‘জিপিটি-৫.৬ সল’ মডেল ব্যবহার করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে গুগলের মালিকানাধীন উইজ নিজস্ব গবেষণায় ‘জেমিনি ৪ আর্গন’ এবং ‘জিপিটি-৫.৬ সল’ মডেলের সহায়তায় একই ধরনের দুর্বলতা শনাক্ত করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

ওপেনএআইয়ের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বৃহৎ সফটওয়্যার কাঠামোর জটিল নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করার সক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে। তবে দুর্বলতা শনাক্তের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট মডেলের নাম এবং গবেষণার বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নিরাপত্তা সতর্কতার প্রভাব ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার পরামর্শে প্যারিস পুলিশের ওয়েবসাইটসহ স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকটি অনলাইন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনওএসের বরাতে বলা হয়েছে, দেশটির সরকারি পরিচয় যাচাই সেবা ডিজিডি, পার্লামেন্ট এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রের ওয়েবসাইটও সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

বেলজিয়ামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সম্প্রচারমাধ্যম এবিসির বরাতে দাবি করা হয়েছে, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা অস্ট্রেলিয়ান সিগন্যালস ডিরেক্টরেটের সরকারি পোর্টালও সম্ভাব্য ঝুঁকির আওতায় এসেছে।

তবে কোনো ওয়েবসাইট সতর্কতামূলকভাবে বন্ধ রাখা এবং প্রকৃতপক্ষে সাইবার হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা এক নয়। সংশ্লিষ্ট সার্ভারে দুর্বল সফটওয়্যার ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, নিরাপত্তা সংশোধনী স্থাপন করা হয়েছে কি না এবং অননুমোদিত প্রবেশের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করেই প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণ করতে হয়।

সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ রাখা, অপ্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং সার্ভারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। বিশেষ করে সরকারি তথ্যভান্ডার, আর্থিক লেনদেন এবং নাগরিক সেবার সঙ্গে যুক্ত ওয়েবসাইটগুলোর নিরাপত্তায় বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত দুটি নিরাপত্তা ত্রুটির নির্দিষ্ট শনাক্তকরণ নম্বর, সংশ্লিষ্ট পিএইচপি সংস্করণ এবং জরুরি সংশোধনীর আনুষ্ঠানিক বিবরণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে বিভিন্ন দেশের ওয়েবসাইট বন্ধের দাবি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর বক্তব্যও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ঘটনাটির ব্যাপকতা এবং বাস্তবে কতগুলো ওয়েবসাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রয়োজন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।