বৃহস্পতিবার আইআরজিসির নৌবাহিনীর এক বিবৃতিতে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর নাম, সেগুলোর মালিকানা, হতাহতের সংখ্যা কিংবা ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পর্কে বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ইরানি বাহিনীর দাবি, পারস্য উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে হামলার শিকার চারটি জাহাজ অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত ছিল। এ অভিযোগের ভিত্তিতেই জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে আইআরজিসি। তবে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রম কীভাবে অবৈধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিবৃতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকেও সতর্ক করেছে আইআরজিসি। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখলে মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির সামরিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে। এই হুঁশিয়ারি দুই দেশের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও এই নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে প্রণালিটিতে সামরিক সংঘাত, জাহাজে হামলা কিংবা নৌযান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে তার প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়লে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ব্যয়, বিমা প্রিমিয়াম ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্যও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তি থাকলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান হামলার কারণে জ্বালানির দামে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য এখানে উল্লেখ করা হয়নি।
সমঝোতা ভেঙে ফের সংঘাত
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে নিয়মিত হামলার ঘটনা ঘটছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সমঝোতার আওতায় দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা শুরুর কথা ছিল।
তবে সমঝোতাটি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে আবারও সংঘাত শুরু হয়। সর্বশেষ হামলার ঘটনা সেই উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহনের ধারাবাহিকতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে তেলবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব বিশ্ববাজারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সর্বশেষ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জাহাজের পরিচয়, হামলার সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে নৌপথে চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আইআরজিসির সর্বশেষ অভিযোগ ও হুঁশিয়ারির বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়।
আপাতত হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে এর সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে নজর রাখছেন সংশ্লিষ্ট মহল।


