বাংলাদেশের জীবন বীমা খাতে প্রিমিয়াম আয়ের বড় অংশ গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) ৩৪টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ এসেছে মাত্র পাঁচটি কোম্পানি থেকে। এর মধ্যে মেটলাইফ বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স একাই সংগ্রহ করেছে মোট প্রিমিয়ামের প্রায় ৪৮ শতাংশ। বিপরীতে, কয়েকটি কোম্পানির আয় নেমে এসেছে কয়েক কোটি টাকার নিচে; একটি প্রতিষ্ঠানের প্রিমিয়াম সংগ্রহ ছিল মাত্র ২ লাখ টাকা।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে জমা দেওয়া কোম্পানিগুলোর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেশের জীবন বীমা ব্যবসায় কোম্পানিগুলোর মধ্যে আয়ের বড় ব্যবধান যেমন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনি নতুন পলিসি বিক্রি, গ্রাহকের আস্থা, দাবি পরিশোধ এবং ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতার পার্থক্যও আলোচনায় এসেছে।
আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩৪টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৩ হাজার ২৬১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ছিল ৮১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। তবে দুটি কোম্পানি এ সময়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দেয়নি। ফলে প্রকাশিত হিসাবের ভিত্তিতে খাতটির সামগ্রিক চিত্র পাওয়া গেলেও সব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তুলনা করা সম্ভব নয়।
শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির আয় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার কাছাকাছি
প্রিমিয়াম আয়ের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে মেটলাইফ বাংলাদেশ। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে কোম্পানিটির মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৯৮৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স সংগ্রহ করেছে ৫৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
দুই প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত প্রিমিয়াম আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা ৩৪টি কোম্পানির মোট আয়ের প্রায় ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত প্রিমিয়াম আয়ের প্রায় অর্ধেকই এসেছে এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে।
তালিকার পরের অবস্থানে রয়েছে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ডেল্টা লাইফের প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ২৬১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, গার্ডিয়ান লাইফের ২৫৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং সোনালী লাইফের ২১৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় ২ হাজার ২৯৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের হিসাবে তাদের অংশ ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ। বাকি কোম্পানিগুলোর জন্য সম্মিলিতভাবে অবশিষ্ট প্রায় ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ আয় এসেছে। এতে জীবন বীমা ব্যবসায় শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কতটা বড়, তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
কয়েকটি কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় খুবই কম
শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপরীতে কয়েকটি জীবন বীমা কোম্পানির প্রিমিয়াম সংগ্রহের পরিমাণ অত্যন্ত কম। দ্বিতীয় প্রান্তিকে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় হয়েছে মাত্র ২ লাখ টাকা। ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আয় ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা, সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।
এই ব্যবধানের পেছনে কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম, নতুন পলিসি বিক্রির সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার মতো বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু একটি প্রান্তিকের আয় দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অবস্থা কিংবা গ্রাহকদের জন্য তার সেবা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। সে জন্য কোম্পানির সম্পদ, দায়, লাইফ ফান্ড, বিনিয়োগ, বীমা দাবি পরিশোধ এবং ধারাবাহিক আয়ের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন পলিসি বিক্রিতেও এগিয়ে দুই প্রতিষ্ঠান
প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় জীবন বীমা কোম্পানির নতুন ব্যবসা সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এই হিসাবে মেটলাইফ বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অবস্থানও শক্তিশালী।
দ্বিতীয় প্রান্তিকে মেটলাইফের প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ১৮১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। ন্যাশনাল লাইফ সংগ্রহ করেছে ১৬৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। দুই কোম্পানির সম্মিলিত আয় ৩৪৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যা ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের মোট প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয়ের প্রায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ।
এ সূচকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটির প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ৮৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আয় ৫৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রগতি লাইফ, পপুলার লাইফ ও আলফা ইসলামী লাইফের প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বেশ কয়েকটি কোম্পানির নতুন পলিসি থেকে আয় ১০ কোটি টাকার নিচে ছিল। বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় ছিল শূন্য। নতুন পলিসি থেকে আয় কম হলে ভবিষ্যতে গ্রাহকভিত্তি সম্প্রসারণ ও ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
গ্রাহকের আস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে ন্যাশনাল লাইফ
প্রিমিয়াম আয়ে এগিয়ে থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা কাজিম উদ্দিন সংবাদমাধ্যম কালবেলাকে বলেন, যথাসময়ে বীমা দাবি পরিশোধের পাশাপাশি লাইফ ফান্ড ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। গ্রাহকদের এই আস্থার কারণেই কোম্পানির ব্যবসা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বলে তাঁর দাবি।
জীবন বীমার ক্ষেত্রে গ্রাহকের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পলিসি গ্রহণের সময় গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন এবং ভবিষ্যতে চুক্তি অনুযায়ী আর্থিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা, সময়মতো অর্থ পরিশোধ এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা গ্রাহকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
ব্যবসা কমার পেছনে কী বলছে পিছিয়ে থাকা কোম্পানিগুলো
প্রিমিয়াম সংগ্রহে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নুর মোহাম্মদ ভুইয়া জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন কোম্পানিটির নতুন পলিসি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এতে আয় কমে যায়। সম্প্রতি আইডিআরএ নতুন পলিসি বিক্রির অনুমতি দিয়েছে। এখন প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তিনি জানান। তাঁর আশা, সামনে কোম্পানির ব্যবসা বাড়বে।
অন্যদিকে, ডায়মন্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান ব্যবসা কমার দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত জুনে শ্রীলঙ্কার একটি কোম্পানি ডায়মন্ড লাইফের ৬০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয়। পাশাপাশি, এজেন্টদের কমিশন নিয়ে কিছু সমস্যাও ছিল। এসব কারণে কোম্পানিটির ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
দুটি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রিমিয়াম সংগ্রহের পার্থক্যের পেছনে শুধু বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়টি নয়, নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধ, মালিকানা পরিবর্তন এবং এজেন্ট ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব কারণের পৃথক আর্থিক প্রভাব নির্ধারণ করতে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় প্রিমিয়াম আয় বেড়েছে
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় ছিল ২ হাজার ৯১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ওই সময়ে প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় হয়েছিল ৬৪৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩৪টি কোম্পানির মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৬১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় হয়েছে ৮১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে মোট গ্রস প্রিমিয়াম আয় ৩৪৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা বেড়েছে। বৃদ্ধির হার প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রথম বছরের প্রিমিয়াম আয় বেড়েছে ১৬৯ কোটি ৩ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২৬ দশমিক ১ শতাংশ।
তবে দুই প্রান্তিকে তথ্য দেওয়া কোম্পানির সংখ্যা এক নয়—প্রথম প্রান্তিকে ৩৬টি, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩৪টি। তাই এই বৃদ্ধিকে পুরো খাতের একই কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি হিসেবে সরাসরি ব্যাখ্যা করার আগে কোম্পানিভিত্তিক তুলনাযোগ্য তথ্য যাচাই করা জরুরি।
খাতের সামনে আস্থা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
জীবন বীমা খাতে মোট প্রিমিয়াম আয় বাড়া ইতিবাচক প্রবণতার ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু সেই আয় যদি অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে খাতের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা ও দুর্বল কোম্পানিগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
প্রিমিয়াম সংগ্রহের পাশাপাশি গ্রাহকের দাবি পরিশোধ, পলিসির শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া, বিনিয়োগের স্বচ্ছতা এবং আর্থিক প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কম আয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবসা পরিচালনার বাধা দূর করার পাশাপাশি তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।
আইডিআরএর প্রকাশিত তথ্য দেশের জীবন বীমা খাতে আয়কেন্দ্রীকরণের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে। তবে বাজারের প্রকৃত স্বাস্থ্য মূল্যায়নে শুধু প্রিমিয়ামের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। কোম্পানিগুলোর আর্থিক স্থিতি, বীমা দাবি নিষ্পত্তির রেকর্ড এবং গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষায় তাদের কার্যক্রমও সমান গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।


