ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন রাজ্য আসামে দুই দিনের উচ্ছেদ অভিযানে ১ হাজার ১০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় এসব অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলেই ৬০০টির বেশি পরিবারের বসতবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানে ১০টিরও বেশি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের অভিযোগ।
সরকারি কর্মকর্তা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর নগাঁও, গোলাঘাট ও হোজাই জেলায় এক দিনে ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। পরদিন রোববার নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযান চালানো হয়। প্রশাসনের দাবি, এসব পরিবার সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বসবাস করছিল। অন্যদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের একটি অংশের দাবি, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সরকারি উদ্যোগেই সেখানে পুনর্বাসন করা হয়েছিল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রল-এর প্রতিবেদনে আসাম বন বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে উচ্ছেদ অভিযানের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযান চলাকালে এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে উচ্ছেদের শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ কিংবা বিকল্প আবাসনের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিন জেলায় এক দিনে উচ্ছেদ ৫৪৭ পরিবার
১৭ অক্টোবর আসামের তিন জেলায় পরিচালিত অভিযানে সবচেয়ে বেশি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে নগাঁও জেলায়। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিনের উচ্ছেদের চিত্র ছিল এমন—
-
নগাঁও: ৩৩৬টি পরিবার
-
গোলাঘাট: ৫৯টি পরিবার
-
হোজাই: ১৫২টি পরিবার
-
মোট: ৫৪৭টি পরিবার
উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরদিন নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৬০০টির বেশি পরিবারের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হলে দুই দিনের অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ছাড়িয়ে যায়।
উচ্ছেদের ফলে এসব পরিবারের দৈনন্দিন জীবন, জীবিকা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারানোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মস্থলে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সমস্যায় পড়তে পারে। তবে কতজন মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে শিশু, প্রবীণ ও নারী কতজন—সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
‘১৯৭৪ সালে সরকার আমাদের পুনর্বাসিত করেছিল’
লুতুমারি এলাকার বাসিন্দাদের বক্তব্যে উচ্ছেদ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ৪৪ বছর বয়সী আবদুন নূর জানিয়েছেন, তাঁর পরিবার ও এলাকার অন্য বাসিন্দারা কয়েক দশক ধরে সেখানে বসবাস করছেন। তাঁর দাবি, সরকারই তাঁদের পূর্বপুরুষদের ওই এলাকায় বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।
নিজের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার পর নূর দ্য স্ক্রল-কে বলেন, ১৯৭৪ সালে সরকার তাঁদের সেখানে পুনর্বাসিত করেছিল। তাঁরা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা ছিলেন। পূর্বপুরুষেরা ভূমিহীন হওয়ায় তাঁদের সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
নূরের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় মোট ৩০০টি ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে পরিবারগুলোর জন্য বরাদ্দ করা জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ বিঘা। তবে জমি বরাদ্দের নথি, মালিকানার ধরন এবং পরবর্তী সময়ে জমির আইনি অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
নূর আরও জানান, উচ্ছেদ ঠেকাতে তাঁরা গৌহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু আদালত থেকে তাঁরা প্রত্যাশিত প্রতিকার পাননি বলে তাঁর অভিযোগ।
এলাকার বাসিন্দাদের একটি অংশ বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবেও কাজ করতেন। নূরের দাবি, বনাঞ্চলে কাজ করার প্রয়োজনেই তাঁদের অনেককে সেখানে বসতি স্থাপনের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিল। ফলে তাঁদের কাছে এলাকাটি কেবল বসবাসের জায়গা নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের জীবিকা ও পারিবারিক ইতিহাসের অংশ।
উচ্ছেদে ১০টির বেশি মসজিদ ভাঙার অভিযোগ
বসতবাড়ির পাশাপাশি ধর্মীয় স্থাপনাও উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় এসেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আবদুন নূরের দাবি, অভিযানে ১০টিরও বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মসজিদ ৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো।
তবে ভেঙে ফেলা মসজিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, অবস্থান, ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর আইনি মর্যাদা এবং এ বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নেই। ফলে মসজিদ ভাঙার বিষয়টি আপাতত স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযোগ স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ আরও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি জমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রশাসনের আইনগত অবস্থান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের বসবাসের দাবির মধ্যে বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
টংগিয়া বন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক
লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। গত জুনে অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস আসাম সরকারকে ওই এলাকার গ্রামবাসীদের পরিকল্পিত উচ্ছেদ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল।
সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, ওই বনাঞ্চলের চারটি গ্রামের বাসিন্দাদের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রচলিত ‘টংগিয়া’ বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় সেখানে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তাঁদের সাধারণ বনভূমি দখলকারী হিসেবে বিবেচনা করার আগে বসতি স্থাপনের ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংগঠনটি মনে করে।
টংগিয়া পদ্ধতি মূলত বন পুনরুদ্ধার ও গাছের পরিচর্যার সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শ্রমকে যুক্ত করে গড়ে উঠেছিল। এ ব্যবস্থায় বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে বসবাসকারী মানুষ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গাছের পাশাপাশি খাদ্যশস্যও চাষ করতেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা পদ্ধতিটি চালু করে। পরবর্তী সময়ে আসামের কিছু বনাঞ্চলেও এর ব্যবহার হয়।
এই ব্যবস্থার আওতায় বসতি গড়ে ওঠা মানেই সব ক্ষেত্রে জমির ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়। আবার দীর্ঘদিনের বসবাস বা সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনের দাবি থাকলে সেসব বিষয়ও আইনগত পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই লুতুমারির বাসিন্দাদের জমির অধিকার নির্ধারণে পুনর্বাসনের নথি, বন বিভাগের রেকর্ড, জমির শ্রেণিবিন্যাস এবং প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করা জরুরি।
চার গ্রামের বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি গ্রামের নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো কন্দর্প লংজাপ, পদুমনি, হাতিজুর এবং ৯ নম্বর খেরোনি।
দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর উচ্ছেদ নিয়ে মূল প্রশ্নগুলো হলো—তাঁদের বসতির ঐতিহাসিক ভিত্তি কী, সরকারি পুনর্বাসনের দাবির পক্ষে কী নথি রয়েছে এবং উচ্ছেদের আগে তাঁদের বক্তব্য শোনার ও আইনি প্রতিকার চাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না। পাশাপাশি উচ্ছেদের পর পরিবারগুলো কোথায় আশ্রয় নেবে, তাদের জীবিকা কীভাবে চলবে এবং শিশুদের পড়াশোনা কীভাবে অব্যাহত থাকবে, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষার যুক্তি তুলে ধরা হলেও বন সংরক্ষণ ও মানুষের আবাসনের প্রশ্নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বনভূমি দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পরিবারের বসবাসের ইতিহাস ও আইনি অবস্থান যাচাই করা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবিক প্রয়োজন বিবেচনা করা জরুরি।
আসামে উচ্ছেদের বৃহত্তর চিত্র
দ্য স্ক্রল-এর সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) গত ১০ বছরের শাসনামলে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজ্যের রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই মুসলিম।
এই পরিসংখ্যান রাজ্যে সরকারি জমি পুনরুদ্ধার ও উচ্ছেদ কার্যক্রমের ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে সব উচ্ছেদ অভিযান একই কারণে পরিচালিত হয়েছে কি না, প্রতিটি ক্ষেত্রে জমির মালিকানা বা বসবাসের অধিকার নিয়ে কী ধরনের বিরোধ ছিল এবং উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর কতজন পুনর্বাসন পেয়েছেন—এসব বিষয়ে আলাদা তথ্য প্রয়োজন।
লুতুমারি লংজাপের ঘটনা তাই কেবল কয়েক শ পরিবারের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বনভূমির আইনি ব্যবস্থাপনা, ঐতিহাসিক পুনর্বাসনের দাবি, ভূমিহীন মানুষের অধিকার এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন।
একদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষায় সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাসকারী মানুষের দাবি ও সম্ভাব্য আইনি অধিকারও যাচাই করা প্রয়োজন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় স্বচ্ছ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নির্ভরযোগ্য নথি যাচাই এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


