গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা সতর্কতা পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেয়। সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি যাচাই এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে ওয়েবসাইটটি ব্যবহারকারীদের জন্য অপ্রবেশযোগ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওয়েবসাইটটি চালু করা হচ্ছে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংযোগ স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। ফলে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার কারণে ব্যাংকগুলোর নিয়মিত কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি বলে জানিয়েছেন তিনি।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে ওয়েবসাইটটি কবে নাগাদ আবার চালু করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। এতে প্রবেশের চেষ্টা করলে রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত একটি বার্তা দেখা যায়। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য ও অনলাইন সুবিধাগুলো সাময়িকভাবে ব্যবহার করতে পারছেন না।
পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ
বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপি-তে শনাক্ত হওয়া গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যালিফ ও উইজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব ত্রুটি শনাক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারও বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে সতর্কতা জারি করেছে।
পিএইচপি বিশ্বের বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে ব্যবহৃত একটি জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা। এ ধরনের সফটওয়্যারে গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের সুরক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। দুর্বলতার ধরন ও ব্যবহৃত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে অননুমোদিত প্রবেশ, তথ্য চুরি কিংবা অনলাইন সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের সতর্কতা পাওয়ার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ডিজিটাল অবকাঠামো পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। কোনো ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখাও ঝুঁকি মোকাবিলার একটি পদক্ষেপ হতে পারে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সরাসরি কোনো সাইবার হামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
২০১৬ সালের সাইবার হামলার স্মৃতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান সতর্কতামূলক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছর হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার সরিয়ে নেয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
ওই ঘটনার পর তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় আসে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল অবকাঠামোতে দুর্বলতা দেখা দিলে সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা ও আর্থিক সেবার ধারাবাহিকতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং তা মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংযোগ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ওয়েবসাইট পুনরায় চালুর আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ শেষ করাই এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয়। তবে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।


