দিনাজপুরের শহরজুড়ে আধুনিকতার ছোঁয়া। সুউচ্চ বহুতল ভবন, সুপার মার্কেট, আধুনিক ফ্ল্যাট আর বিত্তবৈভবের হাতছানি—সবই আছে। কিন্তু এসব পার্থিব আয়োজনের বাইরে এক প্রবীণ মানুষের প্রতিটি সকাল বাঁধা পড়ে আছে ভালোবাসার এক নিঃশব্দ অঙ্গীকারে। বয়স ৮৫ বছর। পেশায় প্রবীণ আইনজীবী। নাম অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। গত ১৫ বছর ধরে প্রতিদিন সকালে তিনি নিজ হাতে পরিষ্কার করছেন প্রয়াত স্ত্রী জাহানারা বেগম ঝর্ণার কবর। শুধু স্ত্রীর কবরই নয়, পরিচ্ছন্ন রাখছেন পুরো কবরস্থানের পথঘাট ও আশপাশের পরিবেশ।
বয়সের ভার কিংবা জীবনের নানা সীমাবদ্ধতা তাঁর এই অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষ করে তিনি ছুটে যান কবরস্থানে। প্রিয়তমা স্ত্রীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেন, তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। এরপর হাতে তুলে নেন ঝাঁটা। কবরের ওপর ও চারপাশে জমে থাকা শুকনো পাতা, গাছের ডালপালা এবং আগাছা সরিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার করেন। ধীরে ধীরে তাঁর এই ব্যক্তিগত ভালোবাসা রূপ নিয়েছে নীরব সামাজিক সেবায়।
প্রায় দেড় দশক ধরে চলে আসা এই নিয়মিত কাজের পেছনে রয়েছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের এক ভালোবাসার গল্প। যে গল্পে আছে সামাজিক বাধা অতিক্রম করে একসঙ্গে পথচলা, পারিবারিক বন্ধন, বিচ্ছেদের বেদনা এবং প্রিয় মানুষটির স্মৃতিকে আগলে রাখার এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস।
সামাজিক বাধা পেরিয়ে গড়ে উঠেছিল সংসার
১৯৭০ সালে সামাজিক নানা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণীকে ভালোবেসে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন মওলা বক্স। তাঁর স্ত্রীর নাম জাহানারা বেগম ঝর্ণা। ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তাঁরা গড়ে তুলেছিলেন নিজেদের সংসার। পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই ছিল তাঁদের দাম্পত্য জীবনের প্রধান ভিত্তি।
দীর্ঘদিনের সেই সংসারে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়েছেন দুজন। তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন তাঁরা। তিন সন্তানই আইন বিষয়ে স্নাতক (এলএলবি) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বাবার পেশাগত পথ অনুসরণ করে তাঁরাও আইনশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন।
সংসার, সন্তান ও পেশাগত দায়িত্বের মধ্য দিয়ে কেটে গেছে তাঁদের জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু চার দশকের সেই সঙ্গ একসময় থেমে যায়। ২০১১ সালে মারা যান জাহানারা বেগম ঝর্ণা। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে গভীর শোক ও নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি হন মওলা বক্স। যাঁর সঙ্গে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো ভাগ করে নিয়েছিলেন, তাঁর অনুপস্থিতি হয়ে ওঠে এক অপূরণীয় শূন্যতা।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই শোককে তিনি অন্যভাবে ধারণ করতে শুরু করেন। স্ত্রীর স্মৃতিকে শুধু মনে লালন করে রাখেননি; প্রতিদিনের একটি নির্দিষ্ট কাজের মধ্য দিয়ে ভালোবাসার সেই বন্ধনকে জীবন্ত রাখার চেষ্টা করেছেন।
ফজরের নামাজের পরই শুরু হয় দিনের অন্য অধ্যায়
স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই কবরস্থানে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন মওলা বক্স। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষ করে সেখানে পৌঁছানো যেন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। প্রথমে স্ত্রীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতেন। এরপর নিজের হাতে কবরটি পরিষ্কার করতেন। সময়ের সঙ্গে এই কাজের পরিধি বাড়তে থাকে।
কবরস্থানে শুধু একটি কবর পরিচ্ছন্ন রাখলেই তাঁর দায়িত্ব শেষ হয় না। আশপাশে ছড়িয়ে থাকা শুকনো পাতা, ডালপালা ও আবর্জনা সরিয়ে দেন তিনি। চলাচলের পথগুলোও পরিষ্কার করেন, যাতে অন্যরা স্বাচ্ছন্দ্যে কবরস্থানে প্রবেশ করতে পারেন এবং স্বজনদের কবরের পাশে দাঁড়াতে পারেন।
এভাবে প্রিয়জনের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ব্যক্তিগত উদ্যোগ একসময় অন্যদের জন্যও উপকারী হয়ে ওঠে। তাঁর এই কাজের মধ্যে নেই কোনো প্রচারের আয়োজন কিংবা স্বীকৃতি পাওয়ার প্রত্যাশা। নীরবে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজটি করে যান তিনি।
বৃষ্টি, শীত কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই গত ১৫ বছরে তাঁর এই অভ্যাসে নিয়মিত বিরতি ঘটাতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আসতে পারে। তবু যত দিন পেরেছেন, তত দিন ধরে রেখেছেন প্রিয় স্ত্রীর কবরের পরিচর্যার এই দায়িত্ব।
মওলা বক্সের কাছে এটি কেবল পরিচ্ছন্নতার কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের দীর্ঘ স্মৃতি, একসঙ্গে কাটানো সময় এবং হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতি গভীর মমতা। যে মানুষটি একসময় তাঁর সংসারের সঙ্গী ছিলেন, মৃত্যুর পরও তাঁর স্মৃতির প্রতি যত্ন নেওয়াকে তিনি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে ধরে রেখেছেন।
পেশাগত জীবনের বাইরেও রয়েছে সামাজিক পরিচয়
অ্যাডভোকেট মওলা বক্স দীর্ঘদিন ধরে দিনাজপুর জজ কোর্টে আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত। পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়েও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। তিনি বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি হিসেবে এলাকার উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগে দীর্ঘদিন সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনজীবনে এমন পরিচিতি ও দায়িত্ব পালনের পরও কবরস্থানে গিয়ে তাঁর দৈনন্দিন ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে তিনি কোনো পদ-পদবি কিংবা সামাজিক মর্যাদার পরিচয়ে নয়, বরং একজন শোকাহত স্বামী হিসেবে উপস্থিত হন। নিজের হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন, প্রার্থনা করেন এবং ফিরে যান।
এই দৃশ্যের মধ্যে রয়েছে জীবনের এক সহজ অথচ গুরুত্বপূর্ণ দিক। পেশা, সামাজিক অবস্থান কিংবা অর্জন মানুষের পরিচয়ের অংশ হলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতি অনেক সময় জীবনের শেষ বয়সেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মওলা বক্সের প্রতিদিনের এই অভ্যাস সেই অনুভূতিরই একটি প্রকাশ।
‘তার ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই’
স্ত্রীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মওলা বক্স। তাঁর ভাষ্য, স্ত্রী নিজের পরিবার, ধর্মীয় পরিচয় ও চেনা পরিবেশ ছেড়ে তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখে সংসার গড়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ভালোবাসা, আস্থা এবং জীবনের পরিচিত পরিসর ছেড়ে নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করার সাহস।
মওলা বক্স বলেন, ‘আমার প্রয়াত স্ত্রী সেদিন নিজের পরিবার, ধর্ম ও চেনা পরিবেশ ছেড়ে কেবল আমার ওপর বিশ্বাস রেখে ঘর বেঁধেছিল। তার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই। তার সেই আত্মত্যাগকে স্মরণ করেই প্রতিদিন কবরস্থানে আসি এবং নিজ হাতে পরিচ্ছন্নতার কাজ করি।’
তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করার পেছনে শুধু দীর্ঘদিনের অভ্যাস কাজ করছে না; রয়েছে অতীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং একসঙ্গে কাটানো জীবনের স্মৃতি ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা। জীবনের পড়ন্ত বেলায় দাঁড়িয়ে তিনি যেন প্রতিদিনের এই কাজের মধ্য দিয়ে নিজের ভালোবাসার ভাষা খুঁজে পান।
কথা বলতে বলতে ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে তিনি আবেগমাখা কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘ভালোবাসা যত বড় হয়, জীবনটা তত নয়।’
মওলা বক্সের প্রতিদিনের এই পথচলা হয়তো খুব সাধারণ একটি দৃশ্য—একজন বৃদ্ধ মানুষ, হাতে ঝাঁটা, সামনে কবরস্থান। কিন্তু এর পেছনের গল্পটি অসাধারণ। কারণ, এখানে ভালোবাসা প্রকাশের জন্য নেই কোনো জাঁকজমক, নেই বড় আয়োজন কিংবা আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন। আছে শুধু নিয়মিত উপস্থিতি, যত্ন এবং প্রিয় মানুষটির স্মৃতির প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতা।
মৃত্যু দাম্পত্য জীবনের শারীরিক সঙ্গের অবসান ঘটিয়েছে, কিন্তু মওলা বক্সের কাছে সম্পর্কটির গুরুত্ব কমিয়ে দিতে পারেনি। প্রতিদিন সকালে স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের মতো করে সেই সম্পর্ককে স্মরণ করেন। পাশাপাশি কবরস্থানের পরিচ্ছন্নতা রক্ষার মাধ্যমে অন্যদের জন্যও রেখে যাচ্ছেন একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
তাঁর জীবনের এই গল্প মনে করিয়ে দেয়, ভালোবাসার প্রকাশ সব সময় বড় কোনো ঘটনার মধ্য দিয়ে আসে না। কখনো কখনো তা ধরা পড়ে প্রতিদিনের ছোট্ট একটি কাজে, নিঃশব্দ দায়িত্ব পালনে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে আগলে রাখা কোনো স্মৃতিতে। আর সেই কাজের মধ্যেই একজন মানুষ খুঁজে নিতে পারেন জীবনের গভীর অর্থ, আত্মতৃপ্তি এবং বেঁচে থাকার প্রেরণা।


