গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদরাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার দিন মাদরাসায় মেয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে মুখ খুলেছেন শিশুটির মা মালিহা। তাঁর দাবি, বাড়ি ফিরে মেয়েটি ভয়ে ও কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার কথা জানিয়েছিল। এমনকি বিষয়টি কাউকে বললে শিক্ষক তাকে মেরে ফেলবেন বলেও শিশুটি জানিয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
শিশুটির বাবা বডিবিল্ডার শাহজালাল রুমির অংশ নেওয়া একটি পডকাস্ট অনুষ্ঠানে দর্শকের অনুরোধে ফোনে এসব কথা বলেন মালিহা। সেখানে তিনি মেয়ের কাছ থেকে শোনা ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। পাশাপাশি অভিযোগ জানানো, মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরদিনের একটি ঘটনা নিয়েও কথা বলেন তিনি।
মালিহার বর্ণনা অনুযায়ী, গত ১৯ অক্টোবর সোমবার সকাল ৮টার দিকে মেয়েকে মাদরাসায় পাঠান তিনি। সাধারণ ক্লাস শেষ হওয়ার পর সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিশেষ আরবি ক্লাস হতো। ওই ক্লাস নিতেন অভিযুক্ত শিক্ষক।
মালিহা বলেন, সেদিন ছুটির পর বাড়ি ফিরে মেয়েকে অস্বাভাবিক চুপচাপ ও ভীত মনে হচ্ছিল। তার চোখেমুখে কান্নার ছাপ ছিল। মা হিসেবে বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি মেয়েকে কী হয়েছে, তা খুলে বলতে বলেন। কিন্তু প্রথমে শিশুটি কিছু বলতে চাইছিল না। বরং বারবার বলছিল, ঘটনা জানালে শিক্ষক তাকে মারবেন, এমনকি মেরেও ফেলতে পারেন।
পরে মায়ের প্রশ্নের জবাবে শিশুটি শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগ করে বলে জানান মালিহা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ে গাল, কপাল ও ঠোঁটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করার কথা জানিয়েছিল। বিষয়টি কোথায় ঘটেছে জানতে চাইলে শিশুটি মাদরাসার সিঁড়ির কথা বলে।
মালিহার দাবি, মেয়ের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, ক্লাস শেষে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিচে নামার সময় শিক্ষক তার হাত টেনে ধরেন এবং সিঁড়িতে ওই ঘটনা ঘটান। শিশুটির ভাষ্য অনুযায়ী, ওই স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে শিক্ষক তাকে ভয় দেখিয়েছিলেন। বাড়িতে গিয়ে কাউকে জানালে কেউ বিশ্বাস করবে না এবং বিষয়টি প্রকাশ করলে তাকে মেরে ফেলা হবে—এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে শিশুটি মাকে জানিয়েছিল।
তবে এসব বক্তব্য শিশুটির মায়ের মাধ্যমে পাওয়া অভিযোগের বিবরণ। ঘটনার প্রতিটি দিক স্বাধীনভাবে যাচাই এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
অভিযোগ জানানোর পরও মেয়েকে মাদরাসায় পাঠান মা
মালিহা জানান, মেয়ের কাছ থেকে ঘটনার কথা শোনার পর তিনি প্রথমে মাদরাসার এক শিক্ষিকা, লুনা ম্যাডামকে বিষয়টি জানান। তাঁর অভিযোগ, ওই শিক্ষিকা বলেছিলেন, এটি প্রথমবারের ঘটনা হওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষককে আরেকটি সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে সন্তানের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটার অভিযোগ শোনার পর মায়ের পক্ষে এ ধরনের আশ্বাসে সন্তুষ্ট হওয়া সম্ভব ছিল না।
এরপর তিনি মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল আলাউদ্দিন সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মালিহার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ভাইস প্রিন্সিপাল মাদরাসায় উপস্থিত ছিলেন না; তিনি ছুটিতে ছিলেন। ফোনে পুরো ঘটনা জানানোর পর তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়, পরদিন অর্থাৎ ২০ অক্টোবর সিঁড়িতেও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি পুরুষ শিক্ষকের ক্লাস নেওয়ার সময় একজন নারী শিক্ষককেও সেখানে রাখা হবে।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া এই আশ্বাসে আস্থা রেখে ২০ অক্টোবর মেয়েকে আবারও সেখানে পাঠান বলে জানান মালিহা।
কিন্তু তাঁর অভিযোগ, ওই দিনও অভিযুক্ত শিক্ষক ক্লাস নেন। ক্লাসের সময় শিক্ষক মেয়েকে বলেছিলেন, তাকে তাঁর পছন্দ এবং বাসার নম্বর জানতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন মালিহা। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, মেয়ে বাড়িতে ফেরার পরপরই ওই শিক্ষক তাঁদের বাসায় চলে আসেন।
মালিহা বলেন, তখন তিনি সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে একা ছিলেন। পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য সেখানে ছিলেন না। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষক বাড়ির দরজায় বারবার ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলতে এবং কথা বলতে বলেন। জবাবে তিনি জানান, এ বিষয়ে সন্তানের বাবার সঙ্গেই কথা বলতে হবে। এরপর তিনি শাহজালাল রুমিকে পুরো বিষয়টি জানান।
পডকাস্টে ফোনে কথা বলার সময় মালিহা মেয়ের প্রতি ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি চান, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
২১ অক্টোবর মাদরাসায় উত্তেজনা, শিক্ষক গ্রেপ্তার
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ২১ অক্টোবর গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়ায় অবস্থিত ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসায় যান শিশুটির পরিবারের সদস্যরা। সেখানে ভাইস প্রিন্সিপাল মোসলেম আহম্মদের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান তাঁরা। পরিবারের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে শিক্ষক অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন। তবে এ দাবির সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এ সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি অভিযুক্ত শিক্ষককে চড় মারেন বলে জানা গেছে। পরে সেখানে উপস্থিত লোকজনও শিক্ষককে মারধর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে জনতার হাত থেকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়।
পরবর্তী সময়ে শিশুটির বাবার দায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২২ অক্টোবর তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদেও তাঁর কারাগারে থাকার বিষয়টি জানানো হয়।
পাল্টা অভিযোগ মাদরাসা কর্তৃপক্ষের
এদিকে, ঘটনার পর মাদরাসা কর্তৃপক্ষও পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছে। তাদের অভিযোগ, শিশুটির পরিবারের সদস্য ও অন্য কয়েকজন মাদরাসায় প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান, শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর করেন এবং নগদ টাকা ও মুঠোফোন নিয়ে যান। মাদরাসার পক্ষ থেকে প্রায় ১৭ লাখ টাকা লুটের অভিযোগও করা হয়েছে।
অন্যদিকে, শিশুটির পরিবার মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। ফলে একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখা এবং কোনো অভিযোগ উঠলে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করা—এ ঘটনাকে ঘিরে এসব বিষয় আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে অল্পবয়সী কোনো শিশু ভয় বা হুমকির কারণে ঘটনা জানাতে না পারলে পরিবারের সদস্যদের সংবেদনশীল আচরণ ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকাও জরুরি। শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা আইনসম্মতভাবে নির্ধারণ—দুটিই ন্যায়বিচারের অপরিহার্য অংশ।


