যশোর জেলায় রাসায়নিক সারের ডিলার নিয়োগে ব্যাপক দলীয়করণ, চরম অনিয়ম এবং দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ সামনে এসেছে। উপজেলা ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে অনুমোদিত ৯৮ জন ডিলারের তালিকার সিংহভাগই শাসক দলের নেতাকর্মী ও তাঁদের নিকটাত্মীয়দের দখলে চলে গেছে। অন্বেষণে দেখা গেছে, অনুমোদিত ডিলারদের মধ্যে অন্তত ৬৫ জনই সরাসরি বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের সাথে যুক্ত কিংবা প্রভাবশালী নেতাদের পরিবারের সদস্য। সারের ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক যোগ্যতা ও দোকান না থাকা সত্ত্বেও নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটিয়ে নেতাদের বয়স্ক মা, স্ত্রী কিংবা একেবারেই অভিজ্ঞতা না থাকা স্বজনদের নামে ডিলারশিপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে নেতা ও তাঁদের স্বজনদের বরাদ্দ
নীতিমালা অনুযায়ী সারের ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং খুচরা বাজারে সার-কীটনাশক বিক্রির সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। চৌগাছা উপজেলায় ডিলার তালিকার শীর্ষে থাকা ‘মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্স’-এর মালিক সেলিম রেজা আউলিয়া নিজে সারের ব্যবসার সাথে কখনো যুক্ত ছিলেন না। তিনি উপজেলা পৌর বিএনপির সভাপতি এবং দীর্ঘদিন ধরে টাইলস ব্যবসার সাথে জড়িত। পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া সারের ডিলারশিপ পরিচালনা সম্ভব কি না জানতে চাইলে তিনি অকপটে জানান, আগে অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি এই ব্যবসা করতে পারবেন এবং সরকার তাঁকে অনুমোদন দিয়েছে।
অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করে পারিবারিক বলয়ে বরাদ্দ দেওয়ার এই চর্চা ছড়িয়ে পড়েছে জেলাজুড়ে।
-
পাতিবিলা ইউনিয়নে বহু বছরের অভিজ্ঞ চারজন আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে সারের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলামের স্ত্রী রহিমা আক্তার লিপিকে।
-
হাকিমপুর ইউনিয়নে ‘মেসার্স নিশান ট্রেডার্স’-এর নামে ডিলারশিপ পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসানের ষাটোর্ধ্ব মা আমেনা বেগম, যিনি টিসিবির ডিলারশিপও এভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান ও ভূয়া চুক্তিনামা দেখিয়ে লাইসেন্স
সারের ডিলার নিয়োগের সরকারি নীতিমালা অমান্য করে দৃশ্যমান কোনো দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান না থাকা ব্যক্তিদের নামেও লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে পরিত্যক্ত গুদাম বা ভূয়া চুক্তিনামা প্রদর্শন করে এই অনুমোদন বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
| উপজেলার নাম | অনুমোদিত ডিলারের নাম ও প্রতিষ্ঠান | প্রার্থীর পরিচয় / দলীয় পদ | যে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে |
| চৌগাছা | মেসার্স চৌগাছা ট্রেডার্স (সেলিম রেজা আউলিয়া) | সভাপতি, চৌগাছা পৌর বিএনপি | মূল ব্যবসা টাইলস, সার বিক্রির পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই |
| চৌগাছা | মেসার্স আমেনা ট্রেডার্স (তরিকুল ইসলাম ডবলু) | সভাপতি, নারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপি | উল্লেখ করা স্থানে প্রতিষ্ঠান নেই, জাল চুক্তিনামা ব্যবহারের অভিযোগ |
| চৌগাছা | রহিমা আক্তার লিপি | স্ত্রী, সাবেক সভাপতি, চৌগাছা বিএনপি | চার অভিজ্ঞ আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে অনভিজ্ঞ স্বামীকে সুবিধা প্রদান |
| চৌগাছা | মেসার্স নিশান ট্রেডার্স (আমেনা বেগম) | মা, সাধারণ সম্পাদক, চৌগাছা বিএনপি | ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা, সার বিক্রির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই |
| মণিরামপুর | মেসার্স সরদার এন্টারপ্রাইজ (তবিবর রহমান রুমু) | খালাতো ভাই, সম্পাদক, মণিরামপুর বিএনপি | নিজের কোনো দোকান নেই, পরিত্যক্ত গুদামঘরের কাগজপত্র ব্যবহৃত |
| মণিরামপুর | মেসার্স নাফিস এন্টারপ্রাইজ (মাসুদ পারভেজ) | ছেলে, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, মণিরামপুর বিএনপি | রাজনৈতিক প্রভাব খাঁটিয়ে অনভিজ্ঞ স্বজনকে ডিলারশিপ প্রদান |
| অভয়নগর | মেসার্স মনিরুল ফারাজী (মনিরুল আলম ফারাজী) | ছেলে, সভাপতি, অভয়নগর বিএনপি | দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ডিলারশিপ অনুমোদন |
| বাঘারপাড়া | আব্দুর রশিদ | আওয়ামী সদস্য ও সাবেক এমপির চালকের ভাই | তথ্য গোপন করে এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রভাবে মনোনীত |
| মণিরামপুর | মেসার্স লাকি এন্টারপ্রাইজ (মোলাম আলী) | আর্থিক জোগানদাতা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ | নীতিমালার শর্ত লঙ্ঘন ও দলীয় প্রভাব |
| মণিরামপুর | মেসার্স জান্নাতুল ফেরদাউস (রওশন আরা খাতুন) | সরকারি সুবিধাভোগী ও ডিবিতে ধৃত ব্যক্তির স্ত্রী | সরকারি দ্বৈত সুবিধা গ্রহণ ও স্বজনপ্রীতি |
প্রশাসনের তদারকির অভাব ও তীব্র অসন্তোষ
মাঠপর্যায়ে সরেজমিন মাঠ কর্মকর্তাদের পর্যালোচনার অভাব এবং প্রশাসনিক ঘাটতি এই হযবরল পরিস্থিতির প্রধান কারণ বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, উপজেলা থেকে জেলা মনিটরিং কমিটিতে যে তালিকা এসেছে, তা কোনো প্রকার সরজমিন যাচাই-বাছাই না করেই অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দেওয়ার কারণে সারের কৃত্রিম সংকট ও বিপণন ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে বঞ্চিত ব্যবসায়ী ও বঞ্চিত বিএনপির একাংশ ইতিমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বাঘারপাড়া, মণিরামপুরসহ বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করা হয়েছে। মণিরামপুরের ২০০৮ সাল থেকে সার ব্যবসা করে আসা বঞ্চিত এক ব্যবসায়ী জানান, সব শর্ত পূরণ ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পদপদবি না থাকায় তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক তদন্ত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যশোর জেলা প্রশাসন তিনটি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ স্থগিত রেখেছে এবং বাঘারপাড়া, চৌগাছা ও মণিরামপুর উপজেলার বিতর্কিত ২১ জন ডিলারের ডিলারশিপের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ যশোরের উপপরিচালক রফিকুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে।
যশোরের জামায়াত নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছেন, যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে বিএনপির তৈরি করে দেওয়া তালিকার ভিত্তিতেই এই ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন হস্তক্ষেপর অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তাঁদের দলের প্রার্থীরা বেশি আবেদন করায় হয়তো তাঁদের সংখ্যা বেশি হয়েছে, তবে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই জেলা প্রশাসনের এখতিয়ার। তদন্ত শেষেই স্পষ্ট হবে এই অযোগ্য ডিলারশিপের ভবিষ্যত কী দাঁড়ায়।


