দেশের প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ৬০৩টি বালাইনাশক পণ্যের নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আবেদন দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। এর মধ্যে হাজারো পণ্যের পরীক্ষাগার ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। অথচ এসব আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না হলেও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কর্টেভা এগ্রিসায়েন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের চারটি রাসায়নিক বালাইনাশক পণ্যের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) ৯১তম সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সভায় ৪৫টি জৈব বালাইনাশকও অনুমোদন পেয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধন কার্যক্রম স্থবির থাকায় দেশীয় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ, নতুন পণ্য বাজারজাতকরণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। তাঁদের প্রশ্ন, অধিকাংশ আবেদনকারীর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লাগলেও কর্টেভার চারটি পণ্যের অনুমোদন তুলনামূলক দ্রুত কীভাবে সম্পন্ন হলো? এতে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ মে পিটাকের ৮৮তম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সভায় ১৬০টি রাসায়নিক ও দুটি জৈব বালাইনাশক অনুমোদন পায়। এরপর ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ৯১তম সভার আগে নতুন বালাইনাশকের নিবন্ধন ও লাইসেন্স প্রদানের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত স্থবির ছিল বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ।
ডিএইর তথ্য অনুসারে, নতুন নিবন্ধন সনদ ও লাইসেন্সের জন্য প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ৬০৩টি পণ্যের আবেদন জমা রয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩০০টি পণ্যের পরীক্ষাগার পরীক্ষা এবং আরও প্রায় ২ হাজার ৩০০টি পণ্যের মাঠপর্যায়ের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। তারপরও আবেদনগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
নতুন বালাইনাশক অনুমোদন নিয়ে উদ্বেগ
বালাইনাশক খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কৃষিতে রোগবালাই ও ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর নতুন পণ্যের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার অগ্রগতির ফলে নতুন নতুন সক্রিয় উপাদান বা মলিকিউল এবং উন্নত ফর্মুলেশনের বালাইনাশক বাজারে আসছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করায় কিছু ক্ষতিকর পোকামাকড় ও রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে প্রচলিত পণ্যের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পণ্য নিবন্ধন ও বাজারজাত করার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নতুন বালাইনাশক অনুমোদন দীর্ঘদিন আটকে থাকলে কৃষকের হাতে কার্যকর বিকল্প পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিলম্ব হতে পারে। প্রচলিত পণ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল না দিলে বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। তবে নতুন পণ্যের অনুমোদনের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা, মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশগত প্রভাব এবং খাদ্যনিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করাও জরুরি।
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিবন্ধনের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ রয়েছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এসিআই ফর্মুলেশনস লিমিটেড, পেট্রোকেম (বাংলাদেশ) লিমিটেড, ইনটেফা, সেতু পেস্টিসাইডস লিমিটেড, লারসেন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, অটো ক্রপ কেয়ার লিমিটেড, নকন লিমিটেড, সাদিক অ্যাগ্রোকেমিক্যালস কোম্পানি লিমিটেড, রাইসকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ লিমিটেড, করবেল ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকেয়ার ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট, মিমপেক্স অ্যাগ্রোকেমিক্যালস লিমিটেড, পদ্মা অ্যাগ্রো স্প্রেয়ার কোম্পানি লিমিটেড, বন্ধন জেনেটিক্স লিমিটেড, দ্য লিমিট অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস লিমিটেড, চেঞ্জস ক্রপ সায়েন্স বাংলাদেশ লিমিটেড, ভার্টেক্স অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও ব্যাবিলন অ্যাগ্রো অ্যান্ড ডেইরি লিমিটেডের নাম রয়েছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জার্মানির বায়ার ক্রপ সায়েন্স এবং সুইজারল্যান্ডের সিনজেনটার মতো প্রতিষ্ঠানের আবেদনও অপেক্ষমাণ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
আবেদন করতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ
সংশ্লিষ্ট দুই ডজন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের আবেদনের দীর্ঘসূত্রতা ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেছে কালবেলা। তাঁদের মতে, একটি বালাইনাশক পণ্যের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় শুধু সরকারি ফি দিলেই হয় না। পরীক্ষাগার ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, বিদেশ থেকে নমুনা বা পণ্য আনা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়।
কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি পণ্যের নিবন্ধনের জন্য সরকারি ফি হিসেবে ২৩ হাজার টাকা দিতে হয়। নতুন কোনো কোম্পানিকে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্য হতে হয়, যার জন্য ৪০ হাজার টাকা ফি দিতে হয় বলে তাঁদের দাবি। এর বাইরে পরীক্ষাগার ও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা, নমুনা আমদানি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির পেছনে পণ্যপ্রতি আনুমানিক আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
এত অর্থ ও সময় বিনিয়োগের পরও বছরের পর বছর আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারছে না। নতুন পণ্য বাজারে আনতে না পারলে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে বিনিয়োগের আগ্রহও কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন নিষ্পত্তি না করে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চারটি পণ্য দ্রুত অনুমোদন দেওয়া হলে স্বচ্ছতা ও সমান সুযোগের প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাঁদের বক্তব্য, বিদেশি বিনিয়োগ বা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পণ্য অনুমোদনের বিরোধিতা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়; বরং সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই নিয়ম, সময়সীমা ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া কার্যকর দেখতে চান তাঁরা।
কর্টেভার অনুমোদন পাওয়া চার পণ্য
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, কর্টেভা এগ্রিসায়েন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের নামে বাজারজাতকরণের জন্য চারটি বালাইনাশক পণ্য অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আবেদনসংক্রান্ত নথিতে ডুপন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের নাম রয়েছে। প্রস্তুতকারক হিসেবে ডাও এগ্রো সায়েন্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড এবং কারিগরি উপাদানের প্রস্তুতকারক হিসেবে কর্টেভা এগ্রিসায়েন্স এলএলসির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কর্টেভা এগ্রিসায়েন্স এলএলসির ঠিকানা যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপোলিস, ইন্ডিয়ানায়।
অনুমোদিত পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সোলারিস ১১.৭ এসসি, গ্যালিলিও ওয়ে ১৮.৭৬ এসসি, গ্যালিলিও সেনসা ৩০ এসসি এবং নোভিক্সিড ৩.৪১ ওডি। এসব পণ্য ভুট্টা, ধান ও ঢ্যাঁড়শের বিভিন্ন পোকামাকড়, ধানের রোগ এবং আগাছা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
সোলারিস ১১.৭ এসসিতে সক্রিয় উপাদান হিসেবে স্পিনেটোরাম ১১.৭০ শতাংশ রয়েছে। নথিতে ভুট্টার ফল আর্মিওয়ার্ম, ধানের ইয়েলো স্টেম বোরার এবং ঢ্যাঁড়শের ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে পণ্যটি ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গ্যালিলিও ওয়ে ১৮.৭৬ এসসিতে পিকোক্সিস্ট্রোবিন ৭.০৫ শতাংশ এবং প্রোপিকোনাজল ১১.৭১ শতাংশ রয়েছে। এটি ধানের শীথ ব্লাইট রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রস্তাবিত। গ্যালিলিও সেনসা ৩০ এসসিতে পিকোক্সিস্ট্রোবিন ৬.৭৮ শতাংশ এবং ট্রাইসাইক্লাজল ২০.৩৩ শতাংশ সক্রিয় উপাদান রয়েছে। পণ্যটি ধানের ব্লাস্ট বা পোড়া রোগ দমনে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, নোভিক্সিড ৩.৪১ ওডিতে রয়েছে ফ্লোরপাইরক্সিফেন-বেনজাইল ১.৩১ শতাংশ এবং পেনক্সসুলাম ২.১০ শতাংশ। ধানের বিভিন্ন ধরনের আগাছা নিয়ন্ত্রণের জন্য পণ্যটি প্রস্তাব করা হয়েছে।
সনদের মেয়াদ তিন বছর
সংশ্লিষ্ট চারটি নিবন্ধন সনদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি সনদের মেয়াদ ইস্যুর তারিখ থেকে তিন বছর। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৩০ দিন আগে নবায়নের আবেদন করার শর্ত উল্লেখ রয়েছে। পণ্যগুলোর উৎপত্তির দেশ থেকে আমদানির অনুমতির বিষয়টিও সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সরবরাহ করা নথিতে চারটি সনদেই স্থানীয় প্রস্তুতকারকের নাম ও ঠিকানার ঘরে ‘প্রযোজ্য নয়’ লেখা রয়েছে। অন্যদিকে, পণ্যগুলোর প্রস্তুতকারক হিসেবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নিবন্ধন, আমদানি ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শর্তগুলো কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান আবেদনকারীদের কেউ কেউ।
দ্রুত অনুমোদনের পেছনে যোগাযোগের দাবি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কর্টেভা এগ্রিসায়েন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের নিবন্ধন ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। ওই যোগাযোগের পর আবেদন নিষ্পত্তিতে তৎপরতা দেখা যায় বলে সূত্রটি দাবি করেছে। তবে এ যোগাযোগের প্রকৃতি, অনুমোদনের সিদ্ধান্তে এর প্রভাব এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর মূল্যায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্লান্ট প্রোটেকশন উইংয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত পরিচালক নাহিদ আমিনের সময়ে পণ্য চারটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কৃষি খাতে বালাইনাশকের নিবন্ধন কেবল ব্যবসায়িক অনুমোদনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, ফসলের সুরক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পরিবেশের ঝুঁকি জড়িত। তাই নিবন্ধনের আগে পণ্যের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। কোন আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, কী কারণে সিদ্ধান্ত আটকে আছে এবং অনুমোদনের জন্য কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে আবেদনকারীদের অনিশ্চয়তা কমতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকাশিত নাগরিক সনদে বালাইনাশকের নিবন্ধনের জন্য আবেদন গ্রহণ, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের মূল্যায়ন ও সুপারিশ এবং নিবন্ধন সনদ প্রদানের প্রক্রিয়ার উল্লেখ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ আবেদনগুলোর বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা নিষ্পত্তির অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পায়নি বলে অভিযোগ করেছে।
কর্টেভার চারটি পণ্যের অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় আবেদনকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, এসব পণ্যের পরীক্ষাগার ও মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন কোন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন কেন একই গতিতে এগোয়নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত নথি ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হলে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা যাচাই করা সহজ হবে।
ডিএই বলছে, বিস্তারিত জানেন পিটাকের সভাপতি
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম কালবেলাকে বলেন, ‘পিটাক মিটিং হয়েছে। কোম্পানিকে সনদ দেওয়া হয়েছে এতটুকু আমি জানি। বিস্তারিত বলতে পারবেন পিটাকের সভাপতি।’
বাংলাদেশ ক্রপ প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিপিএ) সভাপতি ও মিমপেক্স অ্যাগ্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান বলেন, সরকার রাসায়নিক বালাইনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়াতে চায়। এতে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যকে আরও নিরাপদ করার সুযোগ তৈরি হবে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে রাসায়নিক বালাইনাশকের কয়েকটি পণ্যের পাশাপাশি জৈব বালাইনাশকও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তবে অপেক্ষমাণ দেশীয় কোম্পানিগুলোর বিষয়টি সংগঠনের পক্ষ থেকে ডিএইর মহাপরিচালক ও পিটাকের সভাপতিকে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, তাঁদের বলা হয়েছে, ধারাবাহিকভাবে আবেদনগুলোর অনুমোদন দেওয়া হবে। এর আগে সাব-পিটাকের সভায় পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে আরেকটি সভা করার কথা বলা হলেও তা অনুষ্ঠিত হয়নি।
বিসিপিএর এক সদস্য কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘদিন পিটাকের সভা না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের পণ্যের অনুমোদন আটকে রয়েছে। তাঁর মতে, এতে বৈষম্যের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকারের বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দেশীয় কোম্পানিকে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রাখা হলে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ এবং বালাইনাশক খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে. এস. এম. মোস্তাফিজুর রহমান শ্যামল বলেন, সরকার জৈব বালাইনাশককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে আমদানিনির্ভরতার মাধ্যমে কোনো দেশ পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছোট থেকে বড় হতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। তা না হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।
তাঁর মতে, অন্যান্য দেশেও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকশিত করতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়। দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়লে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে, বালাইনাশকের নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং কর্টেভার চারটি পণ্যের অনুমোদনকে ঘিরে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও নথিভিত্তিক তথ্য। অপেক্ষমাণ আবেদনগুলোর বর্তমান অবস্থা, অনুমোদনের জন্য প্রযোজ্য মানদণ্ড এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা প্রকাশ করা হলে দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষকের প্রয়োজন, পরিবেশগত নিরাপত্তা ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় রেখে নিবন্ধনপ্রক্রিয়াকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি।


