অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে

কুড়িগ্রামের উলিপুরে ফেসবুকে গড়ে ওঠা প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সালিশ বৈঠকের পরদিন নাজমা খাতুন (৪৪) নামের এক নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে সালিশে অংশ নেওয়া এক বিএনপি নেতা দাবি করেছেন, উভয় পক্ষের স্বজনদের উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছিল এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।

রোববার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার ধামশ্রেনী ইউনিয়নের পশ্চিম নাওড়া এলাকায় নিজ বাড়ির গোয়ালঘর থেকে নাজমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনদের দাবি, সালিশের পর সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা ও মানসিক চাপে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।

সোমবার (২৭ অক্টোবর) পুলিশ মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠায়।

স্থানীয় বাসিন্দা ও নাজমার স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিম নাওড়া এলাকার আব্দুল খালেকের মেয়ে নাজমা স্বামী থেকে আলাদা থাকতেন। প্রায় ছয় মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে সাইদুর রহমান পলাশ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

স্বজনদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি নিজেকে রেল পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে নাজমার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও ৩০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পলাশ নাজমার সঙ্গে দেখা করতে পশ্চিম নাওড়া এলাকায় যান। তাঁর পরিচয় ও উপস্থিতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে স্থানীয় লোকজন দুজনকে আটকে রাখেন। পরে ওই রাতেই তাঁদের সম্মতিতে বিয়ের আয়োজন করা হয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।

তবে বিয়ের নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র চাওয়া হলে ওই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে। স্থানীয়দের দাবি, পলাশ নামে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম দুলাল চন্দ্র (৫৩)। তিনি উলিপুর উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের খোঁচাবাড়ি এলাকার অমল চন্দ্রের ছেলে। পরিচয় নিয়ে এই জটিলতা দেখা দেওয়ার পর বিয়ের আয়োজন বন্ধ হয়ে যায়। পরে তাঁকে রাতভর আটকে রাখা হয়।

সালিশে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতার অভিযোগ

স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর শনিবার রাতে উলিপুর পৌর শহরের একটি স্থানে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সফি কামাল এবং পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলসহ স্থানীয় কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, যাঁরা দুলাল চন্দ্রকে আটকে রেখেছিলেন, তাঁদের না জানিয়েই সালিশের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করা হয় এবং তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় স্থানীয়দের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

তবে সালিশে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করে ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় উভয় পক্ষের স্বজনদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল এবং উপস্থিত সবার সামনে সেই অর্থ নাজমার স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

অর্থের বিনিময়ে অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং সমঝোতার প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্য নেতাদের বক্তব্য জানা যায়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সালিশের পরদিন উদ্ধার মরদেহ

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ের আয়োজন ভেঙে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাজমা সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। সালিশের পরদিন রোববার দুপুরে বাড়ির গোয়ালঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় তাঁর মরদেহ দেখতে পান স্বজনেরা। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

তবে সামাজিক অপমান বা মানসিক চাপই তাঁর মৃত্যুর কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত আলী সরকার জানান, নাজমার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত নারীর ভাই থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সালিশের সিদ্ধান্ত, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং নাজমার মৃত্যুর মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সালিশে অংশ নেওয়া সবার বক্তব্য যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র সামনে আনা জরুরি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।