গোপালগঞ্জে শিশু মুহিন হত্যা: দুজনের মৃত্যুদণ্ড, একজনের যাবজ্জীবন

গোপালগঞ্জে ১২ বছর বয়সী শিশু তালহা ওরফে মুহিন হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁদের আরও এক বছর করে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এ মামলার অপর আসামি লেয়াকত আলী মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন আদালত।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে গোপালগঞ্জ শিশু ও নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ মোরশেদ আলম এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাওন মোল্লা পলাতক রয়েছেন।

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দেওয়া এ রায়কে ঘিরে নিহত শিশুর পরিবার ও রাষ্ট্রপক্ষ সন্তোষ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছেন।

মাছ ধরা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ মুহিন

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার চন্দ্রদিঘলিয়া গ্রামের বাসিন্দা মানজুরুল ইসলামের ১২ বছর বয়সী ছেলে তালহা ওরফে মুহিন নিখোঁজ হয়। সেদিন সে মাছ ধরা দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু এরপর আর বাড়ি ফিরে আসেনি।

সন্তানের খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। পরিচিতজনদের কাছেও খোঁজ নেওয়া হয়। কিন্তু মুহিনের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

দুই দিন পর, ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে পাওয়া যায় মুহিনের মরদেহ। পরিবারের ভাড়াটিয়া আমিন উদ্দিনের ঘরে রাখা একটি ট্রাংক থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার পর মরদেহ উদ্ধারের এ ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

এরপর নিহত মুহিনের বাবা মানজুরুল ইসলাম চারজনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ঘটনাটি আদালতে গড়ায়।

দীর্ঘ বিচার শেষে রায়

মুহিন হত্যা মামলায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে দুই আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং শাওন মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেক দণ্ডপ্রাপ্তকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের আরও এক বছর কারাভোগ করতে হবে।

অন্যদিকে, মামলার অপর আসামি লেয়াকত আলী মোল্লাকে খালাস দিয়েছেন বিচারক। রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি আদালতে উপস্থিত থাকলেও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত শাওন মোল্লা পলাতক ছিলেন।

আদালতের এ রায়ের মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। ফলে পরবর্তী সময়ে আপিলের মাধ্যমে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া আরও এগোতে পারে।

রায়ে সন্তুষ্ট নিহতের পরিবার

রায় ঘোষণার পর নিহত মুহিনের বাবা ও মামলার বাদী মানজুরুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট। রায় দ্রুত কার্যকরের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।’

সন্তান হত্যার ঘটনায় দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে পরিবারটিকে। রায়ের পর দ্রুত তা কার্যকরের প্রত্যাশা জানিয়েছেন মুহিনের বাবা। তাঁর বক্তব্যে সন্তানের হত্যার বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তবে রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কথা জানিয়েছে আসামিপক্ষ। তাদের বক্তব্য, মামলায় কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই। এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম জুলকদর রহমান বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই। তাই বিচারকের ঘোষিত রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। আশা করি, উচ্চ আদালত থেকে সঠিক রায় পাব।’

সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে রায়: রাষ্ট্রপক্ষ

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বিচারক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এ রায় ঘোষণা করেছেন। তাঁর মতে, এ রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

ফৌজদারি মামলায় প্রত্যক্ষ সাক্ষীর পাশাপাশি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, বস্তুগত আলামত, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণও বিচারিক সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মুহিন হত্যা মামলায় আদালত কোন কোন সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে দণ্ডাদেশ দিয়েছেন, তার বিস্তারিত রায় পর্যালোচনা ছাড়া নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়।

শিশু মুহিনের নিখোঁজ হওয়া, দুই দিন পর ট্রাংক থেকে তার মরদেহ উদ্ধার এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি গোপালগঞ্জে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। আদালতের রায়ের পর নিহতের পরিবার ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আপিলের ঘোষণায় মামলাটির পরবর্তী আইনি অগ্রগতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।

এখন রায় কার্যকরের পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এবং উচ্চ আদালতে আপিল হলে তার নিষ্পত্তির দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।