১৯৭১ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত অভিনেতা তরুণ কুমার। শিল্পীসত্তার পাশাপাশি তাঁর হৃদয়ে জেগে ছিল মানবিকতার দীপশিখা, আর শেকড়ের টানে ছিল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি গভীর মমত্ববোধ।
একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিন!
একদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, অন্যদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল একটি জাতির মরণপণ সংগ্রাম। সেই দুঃসময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার লড়াই ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল মানবতা, ন্যায়বিচার ও মানুষের মুক্তির পক্ষে বিশ্ববিবেকের এক অনন্য জাগরণ।
ভারতের অসংখ্য লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবী সেদিন সোচ্চার হয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে। তাঁদের অনেকে এগিয়ে এসেছিলেন মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে, কেউবা শেকড়ের টানে, পূর্বপুরুষের স্মৃতি ও জন্মভূমির প্রতি গভীর মমত্ববোধে। সেই মানবিক অভিযাত্রায় উজ্জ্বল একটি নাম—তরুণ কুমার।
তিনি কেবল ঘরে বসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের খবর নেননি; সাধ্য অনুযায়ী বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীশিবিরের অসহায় মানুষের দুর্দশা তাঁকে ব্যথিত করত। তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে তিনি নিজের অবস্থান ও সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়েছিলেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওষুধপত্র পৌঁছে দেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং যুদ্ধাহতদের সেবায় চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া—এসব উদ্যোগে তাঁর মানবিক মুখটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। দর্শনা সীমান্তে গিয়েও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ওষুধপত্র পৌঁছে দিতেন এবং আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।
অভিনয়ের জগতে যিনি চরিত্রের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সেই সংকটকালে তিনি বাস্তব জীবনের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার আরেকটি পরিচয় তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কাছে শিল্পের সৌন্দর্য কেবল পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না; মানুষের দুঃখে সাড়া দেওয়ার মধ্যেও তিনি জীবনের সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতেও ভুলতে পারেননি। তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকতেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিজগতের আপনজনেরা—কলিম শরাফী, জহির রায়হান, বেবী ইসলাম, সুভাষ দত্ত, আনোয়ার হোসেন, আলমগীর কবিরসহ আরও অনেকে। তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর স্মৃতি, সংগ্রামের আবেগ এবং একাত্মতার অমলিন বন্ধন।
যশোরের শেকড়, কলকাতার আলো
১৯৩১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তরুণ কুমার। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘বুড়ো’। তাঁর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস বাংলাদেশের যশোরে। যশোর থেকে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা প্রথমে চব্বিশ পরগনার বারাসাতে বসতি স্থাপন করেন, পরে তাঁদের ঠিকানা হয় কলকাতা। তাঁর শ্বশুরবাড়িও বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলায়।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা কলকাতায় হলেও পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে এই আত্মিক যোগ তাঁকে বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি। বরং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তাঁর মানবিক ভূমিকার মধ্য দিয়ে শেকড়ের প্রতি সেই টান যেন নতুন তাৎপর্য পেয়েছিল।
মহানায়কের পাশে থেকেও স্বতন্ত্র এক শিল্পী
তরুণ কুমার ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তম কুমারের ছোট ভাই। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল মহানায়কের ভাই হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা চলচ্চিত্রে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র অভিনয়প্রতিভার অধিকারী এক শক্তিমান শিল্পী—যাঁর সহজাত অভিনয়, সংলাপ পরিবেশনের স্বাভাবিকতা এবং চরিত্রের অন্তর্গত অনুভূতি প্রকাশের ক্ষমতা তাঁকে দর্শকের আপনজন করে তুলেছিল।
দুই ভাই যখন একই পর্দায় উপস্থিত হতেন, তাঁদের অভিনয়ের রসায়ন দৃশ্যগুলোকে করে তুলত অনন্য। উত্তম কুমারের তারকাদ্যুতির পাশেও তরুণ কুমার নিজের অভিনয়দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য অটুট রাখতে পেরেছিলেন। পর্দায় তাঁদের যুগল উপস্থিতি দর্শকের কাছে ছিল বাড়তি আনন্দের, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যা আজও স্মরণীয়।
কর্মজীবনের শুরুতেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি। উত্তম কুমার মহানায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগেই ‘দাদা ঠাকুর’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন তরুণ কুমার। এ অর্জন তাঁর অভিনয়প্রতিভার স্বতন্ত্র স্বীকৃতি।
ব্যক্তিজীবনেও বড় ভাই উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অকৃত্রিম, আন্তরিক এবং সত্যনিষ্ঠ। উত্তমের অভিনয় ভালো লাগলে তিনি তাঁকে প্রণাম করতেন; আবার অভিনয় পছন্দ না হলে নির্দ্বিধায় নিজের মতামত জানাতেন। ‘অমানুষ’ চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের অভিনয় দেখে তাঁর সমালোচনা করার ঘটনাটি দুই ভাইয়ের সম্পর্কের সেই অকৃত্রিমতারই পরিচয় বহন করে। শ্রদ্ধা ছিল, ভালোবাসা ছিল, কিন্তু অন্ধ প্রশংসা ছিল না—ছিল শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা ও সত্য বলার সাহস।
ছয় শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের বর্ণিল অধ্যায়
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তরুণ কুমার প্রায় ছয় শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে—‘দেয়া নেয়া’, ‘দায়-দায়িত্ব’, ‘মনের মতো মন’, ‘রণক্ষেত্র’, ‘জীবন সন্ধান’, ‘দামু’, ‘সংঘর্ষ’, ‘পৃথিবীর শেষ স্টেশন’, ‘পেন্নাম কলকাতা’, ‘পতি পরম গুরু’, ‘অভাগিনী’, ‘নীলিমায় নীল’, ‘নবাব’, ‘রক্তঋণ’, ‘মহাপীঠ তারাপীঠ’, ‘অঘটন আজও ঘটে’, ‘তুমি কত সুন্দর’, ‘কিডন্যাপ’, ‘আবির’, ‘স্বর্ণময়ীর ঠিকানা’, ‘রাজপুরুষ’, ‘নিশিবাসর’, ‘ডাক্তার বউ’, ‘স্বর্গ সুখ’, ‘তিল থেকে তাল’, ‘বৈকুণ্ঠের উইল’, ‘শোরগোল’, ‘সূর্য তৃষ্ণা’, ‘প্রতিদান’, ‘রাজেশ্বরী’, ‘সাগর বলাকা’, ‘সংসারের ইতিকথা’, ‘খেলার পুতুল’, ‘পাহাড়ি ফুল’, ‘বন্ধন’, ‘পাকা দেখা’, ‘পঙ্খীরাজ’ ও ‘সন্ধি’।
বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। কখনো হাস্যরস, কখনো আবেগ, কখনো জীবনের কঠিন বাস্তবতা—বিভিন্ন অনুভূতির প্রকাশে তিনি ছিলেন স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল। তাঁর অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার ক্ষমতা। তাই মহানায়কের ছোট ভাই হয়েও তিনি দর্শকের হৃদয়ে নিজের জন্য আলাদা আসন তৈরি করতে পেরেছিলেন।
শিল্পের ঊর্ধ্বে মানুষ
২০০৩ সালের ২৭ অক্টোবর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন এই গুণী অভিনেতা। পর্দার আলো নিভে গেছে, সময়ের স্রোতে বদলে গেছে বহু পরিচিত মুখ, কিন্তু শিল্পীর সত্যিকারের পরিচয় কেবল তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। তাঁর পরিচয় বেঁচে থাকে সৃষ্টিতে, মানুষের ভালোবাসায় এবং সংকটের দিনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাসে।
তরুণ কুমারকে স্মরণ করতে গিয়ে তাই শুধু বাংলা চলচ্চিত্রের এক প্রতিভাবান অভিনেতার কথা মনে পড়ে না; মনে পড়ে ১৯৭১ সালের সেই মানবিক মানুষটির কথাও, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দুঃসময়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও সহায়তার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। যাঁর পূর্বপুরুষের শেকড় ছিল এই বাংলার মাটিতে, সেই শেকড়ের টান যেন তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল মুক্তিকামী মানুষের পাশে।
কিছু মানুষ তাঁদের শিল্প দিয়ে হৃদয় জয় করেন, আর কিছু মানুষ শিল্পের বাইরেও মানবতার ইতিহাসে রেখে যান অমোচনীয় স্বাক্ষর। তরুণ কুমার ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করি বাংলা চলচ্চিত্রের এই স্বতন্ত্র অভিনয়শিল্পীকে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এই সুহৃদকে।
তাঁর শিল্প বেঁচে থাকুক দর্শকের স্মৃতিতে, তাঁর মানবিকতার গল্প বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।


