সুনামগঞ্জ-৪ (সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে দুটি সেতুর নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া এবং এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। কাজের ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় তাঁকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ, প্রাণনাশের হুমকি ও হয়রানি করা হচ্ছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, নির্মাণকাজে অনিয়ম ও ধীরগতির বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি কাজের খোঁজখবর নিয়েছেন।
ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বুধবার একই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগে সরকারি উন্নয়নকাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার পরিবেশ নিশ্চিত করা, ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিরখলা-১ সেতু ও সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ। ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম ইসলাম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে এই দুটি সেতুর নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন সময়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
চাঁদা দাবি ও কাজ বন্ধের অভিযোগ
ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল ও তাঁর লোকজন বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। দাবিকৃত অর্থ না দেওয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও মাধ্যম ব্যবহার করে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁকে হুমকি দেওয়া এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
শফিকুল ইসলামের দাবি, গত ২০ অক্টোবর দুই দফায় মুক্তিরখলা-১ সেতুর নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া হয়। এতে কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হন সংশ্লিষ্টরা। এর আগে গত ৫ অক্টোবর জেলা যুবদলের এক নেতা তাঁকে ফোন করে হুমকি দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২০ অক্টোবর সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের এক নেতা ফোন করে সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ নিয়েও বিরোধের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার। তাঁর ভাষ্য, ওই দিন বিকেলে একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং কাজ বন্ধ রাখতে বলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মারধরে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত রোলারের চালক মনির, পে-লোডার চালক কবির আহমদ এবং সাইট ঠিকাদার হোসেন আহমদ আহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ঘটনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
মামলায় আসামি করার বিষয়েও অভিযোগ
সেতুর নির্মাণকাজে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় আসামি করে হয়রানি করার অভিযোগও তুলেছেন শফিকুল ইসলাম। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনের সড়কে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একটি মিছিলের ঘটনায় পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। ওই মামলায় তাঁকে ৫১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত বছরের ২৮ মার্চ জামালগঞ্জ থানার বেহেলী ইউনিয়নের করালজান বিল গ্রুপ (খ) জলমহালের অন্তর্গত কাবিলার বিল থেকে মাছ চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁকে ১৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এ ঘটনায় তাঁর সিলেটের বাসায় পুলিশ পাঠানো হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠিকাদারের দাবি, এসব ঘটনা এবং নির্মাণকাজে বারবার বাধা দেওয়ার বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কিত। তবে মামলাগুলোর সঙ্গে সেতুর নির্মাণকাজ নিয়ে বিরোধের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগ অস্বীকার সংসদ সদস্যের
অন্যদিকে, ঠিকাদারের তোলা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল। তাঁর দাবি, ঠিকাদার শফিকুল ইসলামকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। গত মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে স্থানীয় বাসিন্দারা সালামপুর সেতুর গার্ডওয়াল নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি তাঁকে দেখান। এরপর তিনি কাজের মান সম্পর্কে খোঁজ নেন।
সংসদ সদস্যের ভাষ্য, বিষয়টি সরেজমিনে দেখতে বুধবার সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। চাঁদা দাবি কিংবা ঠিকাদারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
বুধবার দুপুরে সালামপুর সেতু পরিদর্শন করেন নুরুল ইসলাম। এ সময় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা নির্মাণকাজে অনিয়ম ও ধীরগতির অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশিত না হওয়ায় এলাকার মানুষ দুর্ভোগে রয়েছেন।
সংসদ সদস্য বলেন, নির্মাণকাজ নিয়ে কথা বলার পর তাঁর বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রকল্পের অনিয়ম আড়াল করতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। তিনি বলেন, উন্নয়নকাজ নিয়ে চাঁদা চাওয়া তো দূরের কথা, কাউকে ধমকও দেননি।
ঠিকাদারকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম বলেন, কোনো মামলা হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে। কাউকে হয়রানি করার প্রশ্নই ওঠে না বলে দাবি করেন তিনি।
কাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে সওজের বক্তব্য
সেতু নির্মাণকাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, কাজে অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি নির্মাণকাজে ধীরগতির বিষয়টি স্বীকার করে জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে কাজের গুণগত মান বজায় রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা নির্মাণকাজে বেআইনি বাধা দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নির্ধারণ জরুরি।
সুনামগঞ্জের এই দুটি সেতুর ক্ষেত্রে একদিকে ঠিকাদারের চাঁদা দাবি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ, অন্যদিকে সংসদ সদস্যের তোলা নির্মাণকাজের অনিয়ম ও ধীরগতির প্রশ্ন—দুই বিষয়ই তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, প্রকল্পের কাজের নথিপত্র, নির্মাণের অগ্রগতি এবং ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের অভিযোগকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।


