বিদ্যুৎ বিলের বাড়তি চাপে ৬৯ শতাংশ পরিবার, সরবরাহেও অসন্তোষ

বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও বাড়তি বিল ও অনির্ভরযোগ্য সরবরাহ তাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভার ৬৯ শতাংশ পরিবার মনে করে, তাদের আয় বৃদ্ধির তুলনায় বিদ্যুৎ বিলের চাপ বেশি। একই সঙ্গে ৫৫ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতাকে খারাপ বা খুব খারাপ বলে অভিহিত করেছে।

অন্যদিকে, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করলেও এর ব্যয় ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতা সেই সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক গণসংলাপে সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করে ক্যাব। অনুষ্ঠানে প্রান্তিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান সমস্যা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

এক দশকে বদলেছে প্রান্তিক পরিবারের জীবনযাত্রা

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ৩৩৪টি এবং শৈলকুপা পৌরসভার ২২২টি পরিবারসহ মোট ৫৫৬টি পরিবারের ওপর সমীক্ষাটি পরিচালনা করা হয়। এতে গত এক দশকে প্রান্তিক বা লাইফলাইন গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, উত্তরদাতাদের ৮৫ শতাংশের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে। একই সময়ে ৭৭ শতাংশ পরিবারের বাসায় বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ফ্রিজ ব্যবহারের হার আগের ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। টেলিভিশন ব্যবহারের হারও ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৮ শতাংশ।

বিদ্যুতের সহজলভ্যতা পরিবারের দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি শিক্ষা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৭৬ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত হয়েছে। এ ছাড়া ৯৭ শতাংশ পরিবার রাতে নিরাপত্তাবোধ বাড়ার কথা জানিয়েছে।

এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, প্রান্তিক পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় বিদ্যুতের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আলো জ্বালানোর বাইরে পড়াশোনা, খাবার সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের প্রয়োজনও বেড়েছে। তবে ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাশ্রয়ী মূল্য ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ আরও প্রকট হতে পারে।

১৩২ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ

বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও সরবরাহসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ক্যাব। সমীক্ষায় সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে মোট ১৩২ দশমিক ২৮ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, সরকারি ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫২ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট-পিক, ১৫০টি কলেজে ৫১ দশমিক ১২ মেগাওয়াট-পিক, রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ২৪ দশমিক ৬০ মেগাওয়াট-পিক এবং শৈলকুপা পৌরসভায় ৪ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।

এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের একটি বড় সুবিধা হলো, নতুন করে বড় পরিসরে জমি অধিগ্রহণ না করেই বিদ্যমান ভবনের ছাদ কাজে লাগানো যায়। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক বিনিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্ভাবনাকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দিতে সুস্পষ্ট নীতিমালা ও কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে আলোচনায় উঠে আসে।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দিয়ে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের প্রস্তাব

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে পরিবারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য বিশ্লেষণের প্রস্তাব দিয়েছে ক্যাব। সংগঠনটির মূল প্রবন্ধে এ বিষয়ে একটি ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

ক্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যকে কাজে লাগিয়ে দরিদ্র পরিবার শনাক্তকরণ এবং সরকারি সহায়তার লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা যেতে পারে। এতে সুবিধাভোগী নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সরকারি ব্যয় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি।

ক্যাবের দাবি, এ পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২১৬ কোটি টাকার মতো পৃথক প্রকল্প ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।

তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। আলোচকদের মতে, দেশের দুর্গম এলাকা ও চরাঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছেন। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য দিয়ে দরিদ্রতা নির্ধারণ করলে এসব পরিবারের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যথাযথভাবে চিহ্নিত করা কঠিন হতে পারে।

এ ছাড়া অনেক নিম্ন আয়ের পরিবার যৌথভাবে একটি বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহার করে। সে ক্ষেত্রে একটি মিটারের আওতায় একাধিক পরিবারের বসবাস বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জটিল হতে পারে। বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেশি হলেই কোনো পরিবার সচ্ছল, কিংবা ব্যবহার কম হলেই পরিবারটি দরিদ্র—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যথাযথ হবে না।

তাই এ ধরনের তথ্যকে সহায়তা বণ্টনের একমাত্র ভিত্তি না করে অন্যান্য আর্থসামাজিক তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যুৎ খাতে জবাবদিহি ও বিকল্প জ্বালানির ওপর গুরুত্ব

গণসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের দায়মুক্তি আইনের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বিদ্যুৎ খাতসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি বিকল্প জ্বালানির উৎস শক্তিশালী করা এবং এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের কার্যকর নীতি ও প্রণোদনা দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, এ খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নীতিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

স্ট্যামফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক শিহাব উদ্দিন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনবল তৈরির ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

প্রান্তিক গ্রাহকদের জন্য তিনটি সুপারিশ

গণসংলাপ শেষে ক্যাব সরকারের কাছে তিনটি প্রধান সুপারিশ তুলে ধরে। এগুলো হলো—লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ।

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম।

সমীক্ষার ফলাফল বলছে, বিদ্যুৎ প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেও সাশ্রয়ী মূল্য ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে বিদ্যুতের ব্যয় নিম্ন আয়ের পরিবারের বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে অনিয়মিত সরবরাহ দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষার পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারণে গ্রাহকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া, সহায়তা বণ্টনে নির্ভুল তথ্য ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা কাজে লাগানো জরুরি। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবার শনাক্তের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।