নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধীদের সঙ্গে জোটের ইঙ্গিত আরব জোটের

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে দেশটির বিরোধী জোটের সঙ্গে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন আরব ইসরায়েলি নেতা আহমাদ তিবি। তাঁর এই অবস্থান ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। পার্লামেন্টে আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

আহমাদ তিবি ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের সদস্য এবং আরব প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জয়েন্ট লিস্ট পার্লামেন্টারি ব্লকের প্রধান। তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহু ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিরোধীদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তাঁর দল।

নেতানিয়াহুর সরকারকে নির্বাচনে পরাজিত করে বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে ইসরায়েলে বিরোধী জোট ‘চেঞ্জ ব্লক’ গড়ে উঠেছে। এই জোটে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি, ইয়ার লাপিদের ইয়েশ আতিদ, ইয়ার গোলানের ডেমোক্র্যাটস, নাফতালি বেনেটের বেয়াখাদ এবং আভিগদোর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতিনু পার্টির নেতারা।

আনাদোলুর হাতে আসা এক লিখিত বিবৃতিতে আহমাদ তিবি বলেন, আরব নাগরিকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ জয়েন্ট লিস্টের জন্য ঐতিহাসিক অর্জন। জনগণের ঐক্যের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রমাণ করেছে। তাঁর ভাষায়, আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে ইসরায়েলে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

তিবি আরও বলেন, নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তাঁরা চেঞ্জ ব্লকের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ার সূচনা হবে নেসেটের স্পিকার আমির ওহানাকে তাঁর পদ থেকে সরানোর উদ্যোগের মধ্য দিয়ে।

তিবির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বুধবার ভোরে ইসরায়েলের তাইব শহরে আয়োজিত এক সমাবেশে জয়েন্ট লিস্টের সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি। এ সময় ভোটকেন্দ্রে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া এবং ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিবি। এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁদের সমর্থকদের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে জোরালো ছিল বলে দাবি করেন তিনি।

বেন-গভিরকে ইঙ্গিত করে তিবি বলেন, তিনি আর পুলিশমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন না এবং তাঁর রাজনৈতিক সময় শেষ হয়ে এসেছে। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পর সরকার পরিবর্তনের উদ্যোগ কীভাবে এগোবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী ফলাফল, দলগুলোর পারস্পরিক সমঝোতা এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার ওপর।

নির্বাচনী ফলে সরকার গঠনে পিছিয়ে নেতানিয়াহুর জোট

ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত নির্বাচনী হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট গণনার পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে ৫৩টি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের তুলনায় এই সংখ্যা আটটি কম। ফলে ডানপন্থী জোটটি এককভাবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, প্রধানত আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সম্ভাব্য আসনবণ্টনে জয়েন্ট লিস্ট ১২টি এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট, যা রা’আম নামেও পরিচিত, সাতটি আসন পেতে পারে। এই হিসাব চূড়ান্ত হলে আরব দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠন কিংবা বিরোধী জোটের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য ১২০ সদস্যের নেসেটে অন্তত ৬১ জনের সমর্থন প্রয়োজন। তাই কোনো জোট এককভাবে এই সংখ্যা অর্জন করতে না পারলে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা কিংবা পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা সেই সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে নির্বাচনী পূর্বাভাস এবং চূড়ান্ত ফল এক বিষয় নয়। আসনসংখ্যা চূড়ান্ত হওয়ার পাশাপাশি কোন দল কার সঙ্গে সরকার গঠনে সম্মত হবে, সেটিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের একটি বড় অংশ ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সংঘটিত যুদ্ধের পরও নিজেদের এলাকায় থেকে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের বংশধর। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জনগোষ্ঠীর অনেকেই বর্তমানে ইসরায়েলের বিভিন্ন আরব-অধ্যুষিত শহর ও এলাকায় বসবাস করেন। তাঁদের সঙ্গে ইহুদি ইসরায়েলিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবধান এবং বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

আরব নাগরিকদের একটি অংশ আবাসনসংক্রান্ত বৈষম্য, সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে নিজেদের বঞ্চিত মনে করেন। ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার বিষয়টি নিয়েও তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এসব কারণে অতীতে অনেক আরব ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থেকেছেন।

এবারের নির্বাচনেও ভোটের আগে আরব নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষের বিষয়টি আলোচনায় ছিল। তাঁদের অনেকে পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি নেতানিয়াহু সরকারের নীতির সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে আরব নাগরিকদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।

নির্বাচনী প্রচারের সময় নেতানিয়াহুর আরববিদ্বেষী বক্তব্য ও মনোভাব নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আরব নাগরিকদের ভোটের হার এবং দলগুলোর প্রতি তাঁদের সমর্থনকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জয়েন্ট লিস্টের মতো দলগুলোর আসন বৃদ্ধি শুধু তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানকেই শক্তিশালী করে না, বরং সরকার গঠনের আলোচনায় আরব প্রতিনিধিদের গুরুত্বও বাড়িয়ে দেয়। ফলে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান বিরোধী জোটের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকটের রাজনৈতিক অবস্থান

নেতানিয়াহুর বিকল্প সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি বিরোধী জোটের অন্যতম প্রধান শক্তি। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে অতীতের সম্পর্ক তাঁকে ইসরায়েলের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

আইজেনকট মিজরাহি-মরোক্কান বংশোদ্ভূত। ইসরায়েলের রাজনীতিতে ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ইহুদি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা ইহুদিদের মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবধান দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে মিজরাহি ভোটারদের একটি বড় অংশ নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে সমর্থন দিয়ে আসছেন। এই প্রেক্ষাপটে আইজেনকটের রাজনৈতিক অবস্থান ও সমর্থনভিত্তি বিরোধী জোটের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান আইজেনকটের বয়স ৬৬ বছর। তাঁর বেড়ে ওঠা তিবেরিয়াস ও ইলাত অঞ্চলে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বেড়ে ওঠা ছিল জেরুজালেমের অভিজাত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে। দুই নেতার পারিবারিক পটভূমি ও রাজনৈতিক যাত্রায় এই পার্থক্য ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোচনায় উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর আইজেনকট নেতানিয়াহুর জরুরি যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাবের কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের জুনে তিনি সেই মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর থেকে নেতানিয়াহু সরকারের নীতি ও নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর অবস্থান বিরোধী রাজনীতিতে গুরুত্ব পেতে থাকে।

গাজা যুদ্ধ আইজেনকটের পরিবারেও গভীর শোকের কারণ হয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় যুদ্ধ চলাকালে তাঁর ২৫ বছর বয়সী ছোট ছেলে গাল নিহত হন। যুদ্ধে তাঁর দুই ভাতিজাও প্রাণ হারান। পারিবারিক এই ক্ষতি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তব্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০২৬ সালের এপ্রিলে ইদিয়োথ আহরোনথ পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে আইজেনকট তাঁর ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে করা শপথের কথা উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, গাল ও তাঁর বন্ধুদের দেওয়া মূল্য বৃথা যেতে দেবেন না। তাঁর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, যুদ্ধের পর ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও নিরাপত্তানীতি নিয়ে তাঁর অবস্থান কতটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে আরব দলগুলোর সমর্থন ইসরায়েলের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। আহমাদ তিবির সহযোগিতার প্রস্তাব সেই সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করেছে। তবে সরকার পরিবর্তনের জন্য বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, আরব প্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং নেসেটে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।