মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ২৯তম বিসিএসে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে তিন উপসচিবকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বুধবার রাতে জারি করা পৃথক তিনটি প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এর আগে পৃথক মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ওএসডি হওয়া তিন কর্মকর্তা হলেন জামালপুরের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার তোফাজ্জল হোসেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) পরিচালক রকিবুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের সচিব নাহিদা বারিক। তাঁরা তিনজনই ২৯তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
সরকারি নথিতে তাঁদের মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়ার তথ্য থাকলেও দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, বিসিএস পরীক্ষার সময় তাঁদের কেউই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেননি। এ অবস্থায় নিয়োগের সময় জমা দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্রের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৯তম বিসিএসে নিয়োগের প্রথম গেজেট প্রকাশিত হয় ২০১১ সালের ১০ জুলাই। ওই গেজেটে প্রশাসন ক্যাডারের ১৮৪ জন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না পাওয়ায় ১৪টি পদ শূন্য রাখা হয়েছিল।
প্রথম গেজেট প্রকাশের প্রায় ১৩ মাস পর আরও কয়েকজন প্রার্থীর নামে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ওএসডি হওয়া এই তিন কর্মকর্তাও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটার যোগ্যতা ও আবেদনসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে অভিযোগ সামনে আসে।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা-সুবিধা পেতে প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা পূরণ এবং নির্ধারিত নিয়মে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে হয়। এ ধরনের সনদ বা তথ্যের সত্যতা নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। ২৯তম বিসিএসের এই তিন কর্মকর্তার নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও দুদকের অনুসন্ধানে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির পর ব্যবস্থা
গত ৪ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় আবেদন না করেও প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ২৯তম বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ নেওয়ার অভিযোগে ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পৃথক ছয়টি মামলা করেছে দুদক।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ চিঠিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়। ওই চিঠি পাঠানোর প্রায় ছয় মাস পর ছয় অভিযুক্তের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রশাসন ক্যাডারের তিন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। তবে বাকি তিন কর্মকর্তার বিষয়ে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাঁরা পুলিশ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা।
বাকি তিন কর্মকর্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাকি
ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের পৃথক মামলা থাকার তথ্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্য তিনজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না আসায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রক্রিয়া চলছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ওএসডি করা প্রশাসনিক ব্যবস্থা; এটি নিজে থেকে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না কিংবা মামলার নিষ্পত্তি নির্দেশ করে না। অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পৃথক প্রক্রিয়া। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণে তদন্ত, মামলার অগ্রগতি এবং কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগের যোগ্যতা ও নথিপত্রের সত্যতা নিশ্চিত করা সরকারি নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও যথাযথ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তিন উপসচিবকে ওএসডি করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো। তবে বাকি তিন কর্মকর্তার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি কী হয়, তা এখন দেখার বিষয়।


