নেত্রকোনার মদনে ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। আগামী ১১ নভেম্বর মামলাটির রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত। মামলার আসামি মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদী আদালতে নিজের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ জমিসহ জীবনের সব সম্পদের বিনিময়ে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হলে স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ এবং দেখাশোনা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও তিনি আদালতকে জানান। তবে আপসের বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য উপস্থাপনের চেষ্টা নাকচ করে দিয়েছেন বিচারক।
গত বুধবার নেত্রকোনা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আব্দুছ সালামের আদালতে মামলাটির যুক্তিতর্ক শেষ হয়। পরে রায় ঘোষণার জন্য ১১ নভেম্বর তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নুরুল কবীর।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেদিন বিকেলে যুক্তিতর্ক চলাকালে বিচারকের অনুমতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ চান ৩০ বছর বয়সী আসামি আমান উল্লাহ মাহদী। তিনি জানান, তাঁর ১২ থেকে ১৫ শতাংশ জমি রয়েছে। মামলায় মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে জমিসহ জীবনের সব সম্পদ ছেড়ে দিতেও তিনি রাজি। কারাগারে দীর্ঘদিন থাকতে হলে পরিবারের দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে বলে আদালতকে জানান তিনি।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আপসের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে বিচারক তা নাকচ করে দেন। ফলে নির্ধারিত বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী মামলাটির যুক্তিতর্ক শেষ হয়। এখন রায়ের জন্য অপেক্ষা করছেন উভয় পক্ষ।
ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নুরুল কবীর জানান, মামলার বিচারিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনও রয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী শিশুর জন্ম দেওয়া নবজাতকের ডিএনএর সঙ্গে অভিযুক্ত মাদ্রাসাশিক্ষকের ডিএনএর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এই প্রতিবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
শিশুটির অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই মামলাটি এলাকায় আলোচনার জন্ম দেয়। শিশুটির বয়স, তার নিরাপত্তা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবেন আদালত। আগামী ১১ নভেম্বর রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
অসুস্থতার পর প্রকাশ পায় ঘটনা
শিশুটির পরিবার ও মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর আগে আমান উল্লাহ মাহদী একটি মহিলা কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মা-বাবার বিচ্ছেদের পর শিশুটি তার নানার বাড়িতে থাকত এবং ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত। তার মা সিলেটে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন।
একপর্যায়ে শিশুটি অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে এবং তার শরীরে শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। খবর পেয়ে তার মা বাড়িতে ফিরে আসেন। পরে গত ১৮ এপ্রিল মদন পৌর শহরের একটি ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা শিশুটিকে অন্তঃসত্ত্বা বলে জানান।
এরপর পরিবারের সদস্যদের কাছে শিশুটি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা খুলে বলে বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। শিশুটির মা অভিযোগের বিচার চেয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বাড়িতে যান। কিন্তু সেখানে অভিযুক্তের বড় ভাই মাইমন (৩২) তাঁকে গালমন্দ ও মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর শিশুটির মা আইনের আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মামলা, গ্রেপ্তার ও অভিযোগপত্র
২৩ এপ্রিল শিশুটির মা বাদী হয়ে মাদ্রাসাশিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদী এবং তাঁর বড় ভাই মাইমনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার পর অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ অভিযান চালায়। ৬ মে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শিশুটির নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে আদালত ১২ মে তাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সিলেটের একটি সেফ হোমে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেখানে অবস্থানকালে ২ জুলাই শিশুটি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়।
পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে ২৯ জুলাই নবজাতক ও তার মায়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরে সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদনে নবজাতকের সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকের ডিএনএর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে জানায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মদন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আখতারুজ্জামান ২৭ আগস্ট শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহদী ও তাঁর বড় ভাই মাইমনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এরপর মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলে।
শিশুর সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রত্যাশা
শিশুটির বয়স ও তার প্রতি সংঘটিত অপরাধের অভিযোগের কারণে মামলাটিতে শিশুর সুরক্ষা, গোপনীয়তা এবং ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় প্রকাশ না করা, নিরাপদ পরিবেশে রাখা এবং প্রয়োজনীয় মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুটিকে সেফ হোমে পাঠানোর সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল তার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করা। মামলার বিচার চলাকালে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে।
এখন মামলার রায়কে ঘিরে অপেক্ষা তৈরি হয়েছে। আসামির সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব কিংবা পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে তাঁর উদ্বেগের চেয়ে মামলার অভিযোগ, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিচারিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। আগামী ১১ নভেম্বর আদালতের রায়ে মামলাটির পরবর্তী পরিণতি জানা যাবে।


