যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক গবেষণাগারে আগুন, আহত কর্মী

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক স্থাপনা সাভানা রিভার ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সন্ধ্যায় দেশটির সাউথ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের আইকেনের কাছে অবস্থিত সাভানা রিভার সাইট (এসআরএস) কমপ্লেক্সে এ আগুন লাগে। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ ঘটনায় অন্তত একজন কর্মী সামান্য আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

মার্কিন জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পরপরই জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার বাইরে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পারমাণবিক গবেষণা ও উপকরণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এই স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনায় সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে উদ্ধার ও জরুরি সাড়াদান কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত নন, এমন কর্মীদের কাজ বন্ধ রেখে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন কোনো যানবাহন যাতে কমপ্লেক্সে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আশপাশের রেলপথ, নদীপথ ও আকাশপথেও সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং তেজস্ক্রিয়তা জরিপের পর জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়। ওই জরিপে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত না হওয়ায় আগে জারি করা নিরাপত্তামূলক বিধিনিষেধও তুলে নেওয়া হয়। এরপর বৃহস্পতিবার থেকে সাইটটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুনটি মূলত একটি কক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ওই প্রতিবেদনে স্থাপনাটির ভেতরে ফিল্টারবিহীন তেজস্ক্রিয় পদার্থ নির্গমনের বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে। এ তথ্যের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাইরে তেজস্ক্রিয় দূষণ না ছড়ানোর সরকারি বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে। ফলে নির্গমনের প্রকৃতি, পরিমাণ এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ফলাফল বা নির্গমনের মাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

অগ্নিকাণ্ডে আহত কর্মীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তাঁর আঘাতের ধরন, শারীরিক অবস্থা কিংবা আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। আগুনটি কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মার্কিন পারমাণবিক কর্মসূচিতে সাভানা রিভার সাইটের ভূমিকা

সাভানা রিভার সাইট যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক কর্মসূচির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। স্নায়ুযুদ্ধের শুরুর দিকে, ১৯৫০-এর দশকে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয় উপকরণ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে এই কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল। পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা ছিল দুই দেশের প্রতিরক্ষা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রাথমিক পর্যায়ে এসআরএসে প্লুটোনিয়াম ও ট্রিটিয়াম উৎপাদনের জন্য একাধিক পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এসব উৎপাদনকারী চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হলেও কমপ্লেক্সটির কৌশলগত গুরুত্ব কমেনি। বর্তমানে এটি পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবস্থাপনা, ট্রিটিয়াম প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।

ট্রিটিয়াম হাইড্রোজেনের একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ। নির্দিষ্ট ধরনের পারমাণবিক ওয়ারহেডে এটি ব্যবহার করা হয়, যাতে অস্ত্রের বিস্ফোরণক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে। সময়ের সঙ্গে ট্রিটিয়ামের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রের নির্ধারিত কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে এর ব্যবস্থাপনা ও পুনঃপূরণের প্রয়োজন হয়। এসআরএস এ ধরনের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এ ছাড়া পারমাণবিক উপকরণের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং দূষিত পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজও এই কমপ্লেক্সের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। পারমাণবিক স্থাপনায় এসব কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা বিশেষ গুরুত্ব পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার আধুনিকীকরণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে সাভানা রিভার সাইটে প্লুটোনিয়াম কোর তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজও চলছে। প্লুটোনিয়াম কোর পারমাণবিক ওয়ারহেডের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ কারণে স্থাপনাটির নিরাপত্তা ও কার্যক্রম দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এ অবস্থায় গবেষণাগারটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। যদিও সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, স্থাপনার বাইরে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়নি এবং জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছে, তবু আগুন লাগার কারণ ও সম্ভাব্য নির্গমন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের ওপরই ঘটনার ঝুঁকি ও প্রভাবের স্পষ্ট চিত্র নির্ভর করবে।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।