শেখ হাসিনা-রেহানাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দুদকের প্রতিবেদন ৩১ জানুয়ারি

‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪১টি ব্যাংকের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর বোন শেখ রেহানা ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। আগামী ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ শাহজাহান কবিরের আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত ছিল। তবে তদন্তকারী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে না পারায় আদালত নতুন তারিখ ধার্য করেন।

মামলার তৃতীয় আসামি মো. নজরুল ইসলাম মজুমদার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক সভাপতি এবং এক্সিম ব্যাংক পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান। দুদকের অভিযোগ, তাঁর নেতৃত্বে বিএবির নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের অনুকূলে অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।

দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ গত ৩ সেপ্টেম্বর এ মামলা করা হয়। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ধারায় অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, অপরাধে সহায়তা এবং দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগের বিচার হতে পারে।

৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ১৯৯৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ গঠন করেন। ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টিদের বিষয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে আজীবন সভাপতি এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে শেখ রেহানাকে সভাপতির দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

দুদকের অনুসন্ধানে দেশের ৪১টি তফসিলি ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করা তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করা হয়। সংস্থাটির অভিযোগ, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রভাব কাজে লাগিয়ে নজরুল ইসলাম মজুমদার বিএবির নির্বাহী কমিটির সভায় বিষয়টি উত্থাপন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সভার নির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি না থাকলেও বিবিধ আলোচনার অংশ হিসেবে ট্রাস্টে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। পরে নির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠানো হয়।

দুদকের দাবি, এসব চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৪১টি ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে মোট ২৭৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। সংস্থাটির অভিযোগ, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন, যা রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে।

সিএসআর নীতিমালা নিয়ে দুদকের প্রশ্ন

মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যাংকের সিএসআর তহবিল ব্যবহারের নীতিমালা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০০৮ সালের ১ জুনের ডিওএস সার্কুলার এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘পলিসি গাইডলাইন অন করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ফর ব্যাংকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস’-এর বিধান উল্লেখ করে দুদক দাবি করেছে, সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় এ ধরনের ট্রাস্টে অনুদান দেওয়ার অনুমোদন নেই।

সিএসআর হলো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে পরিচালিত কার্যক্রম। এর আওতায় সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করা হয়। তবে কোন খাতে অর্থ দেওয়া যাবে, তা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীতিমালা ও নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।

দুদকের অভিযোগ, সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়নি। নজরুল ইসলাম মজুমদার বিএবির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিজের অবস্থান ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যাংকগুলোকে অর্থ দিতে বাধ্য করেছিলেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাস্টের কার্যক্রম নিয়ে অনুসন্ধান

দুদকের মামলার বিবরণে আরও বলা হয়েছে, সরেজমিন পরিদর্শনে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’-এর ঠিকানায় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির দাবি, ট্রাস্টটির সমাজসেবা অধিদপ্তর ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধনের তথ্যও পাওয়া যায়নি।

দুদকের অভিযোগ, ট্রাস্টের নামে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও প্রতিশ্রুত কার্যক্রমের প্রমাণ মেলেনি। এ অবস্থায় ব্যক্তিগত লাভের অসৎ উদ্দেশ্যে ট্রাস্টের নাম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না, তা মামলার তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে ট্রাস্টের কার্যক্রম, নিবন্ধন এবং অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে দুদকের অনুসন্ধানে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। ট্রাস্টের নামে সংগৃহীত অর্থের প্রকৃত ব্যবহার, অর্থ স্থানান্তরের নথি এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য তদন্ত প্রতিবেদনেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।

তদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে পরবর্তী পদক্ষেপ

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২০২৭ সালের ৩১ জানুয়ারি নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। নির্ধারিত দিনে দুদক প্রতিবেদন জমা দিতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। প্রতিবেদন দাখিলের পর তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী বিচারিক পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।

এ মামলার মূল প্রশ্নগুলো হলো—ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, অর্থের চূড়ান্ত ব্যবহার কোথায় হয়েছে এবং এতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা হয়েছে কি না।

এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে তদন্তে সংগৃহীত নথিপত্র, ব্যাংকগুলোর আর্থিক রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ওপর। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।