বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়ানো এক দৃঢ়চেতা বিশ্বনেত্রী
ইতিহাসে কিছু মানুষের পরিচয় কেবল তাঁদের রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁদের পরিচয় হয়ে ওঠে একটি জাতির দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর সাহস, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের ইতিহাসে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী।
১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞে পূর্ববাংলা পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুপুরীতে, যখন লাখো মানুষ প্রাণ বাঁচাতে মাতৃভূমি ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছিলেন, তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন দৃঢ় প্রত্যয়ে।
এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা, আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বনেতাদের সমর্থন আদায়ে তাঁর ভূমিকা আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
তিনি শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসেও ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি সুহৃদ। তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি চিরস্মরণীয়—একাত্তরের মহান বন্ধু।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
১৯১৭ সালের ১৯ নভেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে এক রাজনৈতিক ও ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরু। তাঁর পিতা পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। মাতা কমলা নেহরুও ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী।
রাজনৈতিক সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং দেশপ্রেমের আবহেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হন। মাত্র ১২ বছর বয়সে শিশু-কিশোরদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বানর সেনা’, যারা স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করত।
১৯৪২ সালের ২৬ মার্চ পারিবারিক ও সামাজিক বাধা অতিক্রম করে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন ফিরোজ গান্ধীর সঙ্গে। তাঁদের দুই পুত্র—রাজীব গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধী। পরবর্তী সময়ে রাজীব গান্ধীও ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন।
শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক অভিযাত্রা
ইন্দিরা গান্ধীর শিক্ষাজীবন ছিল বিচিত্র ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। সুইজারল্যান্ডের বেক্সের একোল নুভেল, জেনেভার একোল ইন্টারন্যাশনাল, পুনে ও বোম্বের পিউপিলস ওন স্কুল এবং ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলের ব্যাডমিন্টন স্কুলে পড়াশোনা করেন তিনি।
কিছু সময় শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতেও অধ্যয়ন করেন। পরে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সামারভিল কলেজে আধুনিক ইতিহাস বিষয়ে পড়তে যান। অসুস্থতার কারণে সেখানে তাঁর পড়াশোনা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে অক্সফোর্ডের সেই শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছিল।
১৯৫৯ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৪ সালে পিতা জওহরলাল নেহরুর মৃত্যুর পর লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনটি ধারাবাহিক মেয়াদসহ মোট চার দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম দফা ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৭ সাল এবং দ্বিতীয় দফা ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত।
দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাঁর দক্ষতা তাঁকে বিশ্বরাজনীতির অন্যতম আলোচিত নেত্রীতে পরিণত করেছিল।
একাত্তরে বাংলাদেশের পাশে ইন্দিরা গান্ধী
১৯৭১ সাল। বাঙালি জাতির জীবনে একদিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন, অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর গণহত্যা। ২৫ মার্চের কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর শুরু হয় ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞগুলোর একটি। গ্রাম-জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, হত্যা করা হয় নিরীহ মানুষকে, নারীদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ মানুষ ছুটে যান ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে।
সেই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এক অসাধারণ মানবিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন।
প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে ভারত আশ্রয় দেয়। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে শরণার্থীশিবির। তাঁদের খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে ভারতকে বহন করতে হয় বিপুল অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ।
কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী মানবিক দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি।
শুধু শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েই তিনি দায়িত্ব শেষ করেননি। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে শুরু করেন ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে বৈঠক করেন। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ সফর করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যা ও বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাকিস্তানপন্থী অবস্থানের বিপরীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ২০ বছর মেয়াদি শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যুদ্ধের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে এই চুক্তি ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিল।
এদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সম্মিলিত প্রতিরোধ একসময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পথ তৈরি করে।
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তান ভারতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ চালানোর পর ভারত সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের।
ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্ব, কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভারতের সামরিক সহায়তা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তাই ১৯৭১ সালে তাঁর অবদান কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতা নয়; এটি ছিল একটি নির্যাতিত জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষার পাশে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালের ২৫ জুলাই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ইন্দিরা গান্ধীকে মরণোত্তর ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’ প্রদান করেন।
তাঁর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন পুত্রবধূ ও তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী।
এটি ছিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা, যা প্রথমবারের মতো কোনো বিদেশি রাষ্ট্রনায়ককে প্রদান করা হয়।
একাত্তরের সেই অকৃত্রিম বন্ধুত্বের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার এক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হয়ে আছে এই সম্মাননা।
লৌহমানবী: সাফল্য, বিতর্ক ও কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন আপসহীন ও দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেতা। তাঁর শাসনামলে ভারত ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ লাভ করেন।
তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিতর্কমুক্ত ছিল না। ১৯৭৫ সালে তিনি দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এ সময় নাগরিক অধিকার সংকুচিত হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে গ্রেপ্তার হন। তাঁর শাসনামলের এই অধ্যায় ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে আজও গভীর বিতর্কের বিষয়।
১৯৭৭ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রথম দীর্ঘ প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে। কিন্তু ১৯৮০ সালের নির্বাচনে আবারও বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসেন তিনি।
আশির দশকের শুরুতে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করে। খালিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে সশস্ত্র তৎপরতা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় সংকট হয়ে দেখা দেয়।
১৯৮৪ সালের জুন মাসে ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে অমৃতসরের শিখ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান স্বর্ণমন্দির প্রাঙ্গণে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘অপারেশন ব্লু স্টার’ পরিচালনা করে। অভিযানে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে ও তাঁর অনুসারীদের অনেকে নিহত হন। তবে প্রাণ হারান বহু নিরীহ মানুষও এবং পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এই সামরিক অভিযান শিখ সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও বেদনার সৃষ্টি করে। এর রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিঘাত পরবর্তী সময়ে ভারতকে ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
৩১ অক্টোবর ১৯৮৪: এক রক্তাক্ত পরিণতি
১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ভারতের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন।
সেদিন নয়াদিল্লিতে নিজের সরকারি বাসভবনের প্রাঙ্গণে দুই শিখ দেহরক্ষী—সতওয়ান্ত সিং ও বেয়ান্ত সিংয়ের গুলিতে গুরুতর আহত হন ইন্দিরা গান্ধী। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
অপারেশন ব্লু স্টারের প্রতিশোধ হিসেবেই তাঁর দুই দেহরক্ষী এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল।
৬৬ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ভারতের এই প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ শিখবিরোধী সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়, যা দেশটির ইতিহাসে আরেকটি গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধীর অবস্থান
ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী নারী রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর নেতৃত্বে ভারত ১৯৭১ সালের যুদ্ধে বিজয় অর্জন করে, ১৯৭৪ সালে প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করে।
জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের রাজনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন যেমন অর্জনে সমৃদ্ধ, তেমনি সিদ্ধান্ত ও শাসনপদ্ধতি নিয়ে রয়েছে নানা সমালোচনা ও বিতর্ক।
তবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান একটি স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। কারণ, ১৯৭১ সালে তিনি শুধু একজন প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি; একটি নির্যাতিত জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অবস্থান ব্যবহার করেছিলেন।
একাত্তরের সুহৃদ, ইতিহাসের অমলিন নাম
ইতিহাসের মূল্যায়ন সব সময়ই বহুমাত্রিক। কোনো রাষ্ট্রনায়ককে শুধু তাঁর সাফল্য দিয়ে কিংবা শুধু ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করা যায় না। ইন্দিরা গান্ধীর জীবনেও রয়েছে অর্জন, বিতর্ক, সাহসী সিদ্ধান্ত ও কঠিন রাজনৈতিক পরিণতির নানা অধ্যায়।
কিন্তু বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবেই।
যখন বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় খুঁজছিল, যখন মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছিলেন, যখন বিশ্বরাজনীতির অনেক শক্তিধর রাষ্ট্র পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল—তখন ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শক্তিকে নিয়োজিত করা—এসব অবদান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের সঙ্গে তাই জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের পাশাপাশি কিছু বিদেশি সুহৃদের অবদানও। তাঁদের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজও যখন আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করি, যখন বিজয়ের গৌরবগাথা উচ্চারণ করি, তখন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি এই দৃঢ়চেতা নারী রাষ্ট্রনায়ককে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর নাম শুধু একটি বিদেশি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর নাম নয়; এটি একাত্তরের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানো এক অকৃত্রিম সুহৃদের নাম।
শ্রদ্ধাঞ্জলি ও বিনম্র প্রণাম—
ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী।
একাত্তরের মহান সুহৃদ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম।
আপনার অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকবে।


