ভারতের মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস জেলায় এ ঘটনা ঘটেছে। বিষাক্ত বা ভেজাল মদ পান করে ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত শুরু করার পর পুলিশ এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, পরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক ব্যবহার করে নকল মদ তৈরি এবং তা বাজারজাত করার সঙ্গে একটি চক্র জড়িত থাকতে পারে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি, এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত অজয় রাঠোর ভারতের ইন্দোরের বাসিন্দা। গত সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাড়িতে মদ তৈরির পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। এআই থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি মদ তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে সেই অসম্পূর্ণ তথ্য কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সংগ্রহের উদ্যোগ নেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ জন্য অজয় ইন্টারনেটে বিভিন্ন রাসায়নিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের খোঁজ করেন। একপর্যায়ে ইন্দোরের ‘রাইজিং ব্রাদার্স’ নামের একটি দ্রাবক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। সেখান থেকেই মদ তৈরির কাজে ব্যবহারের জন্য একটি রাসায়নিক সংগ্রহ করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
পুলিশের অভিযোগ, ১ অক্টোবর ওই রাসায়নিক হাতে পাওয়ার পর অজয় ও তাঁর সহযোগীরা বেআইনিভাবে মদ তৈরি শুরু করেন। তৈরি করা তরল পুরোনো ও ফেলে দেওয়া মদের বোতলে ভরে বাজারে বিক্রি করা হতো। এমনকি আসল মদের সঙ্গে নকল মদ মিশিয়ে গ্রামাঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়েছিল বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা।
এভাবে নকল মদ বাজারজাত করার ফলে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল ও ভেজাল মদের পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পুরোনো মদের বোতল ব্যবহার এবং আসল মদের সঙ্গে নকল তরল মিশিয়ে দেওয়ার কারণে ক্রেতারা প্রতারিত হয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করছে পুলিশ।
এ ঘটনায় রাসায়নিক সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ইন্দোরের আরেক বাসিন্দা আমন কাসলিওয়ালকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১১ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে যে গুদাম থেকে রাসায়নিক সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটি সিলগালা করেছে পুলিশ। সেখান থেকে বিভিন্ন নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন নকল মদের নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
পুলিশের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাসায়নিকটির প্রকৃতি এবং মানবদেহে এর সম্ভাব্য প্রভাব। মদ তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কোনো অনুপযুক্ত রাসায়নিক পানীয়টির সঙ্গে মিশে থাকলে তা গুরুতর বিষক্রিয়া ও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। তবে এ ঘটনায় ঠিক কোন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেটির কারণে মৃত্যুগুলো ঘটেছে কি না, তা পরীক্ষার ফলাফল ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
তদন্তকারীরা বলছেন, ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে অভিযুক্তদের তৈরি মদের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করা গেলে মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসবে। সে জন্য রাসায়নিক, উদ্ধার করা তরল এবং সন্দেহভাজন মদের নমুনা পরীক্ষার ফলাফলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ঘটনা আবারও অবৈধভাবে তৈরি মদ বাজারজাত করার ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মদ তৈরির ক্ষেত্রে রাসায়নিকের ভুল ব্যবহার বা অনিয়ন্ত্রিত মিশ্রণ মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে পাওয়া তথ্যও সব সময় নির্ভুল বা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে রাসায়নিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যাচাই ছাড়া এমন তথ্য অনুসরণ করলে ভয়াবহ পরিণতি ঘটতে পারে। তবে দেওয়াসের ঘটনায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং অভিযুক্তদের দায় ফরেনসিক প্রতিবেদন ও তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।


