হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিস্ফোরণ, আগুনে পুড়ল চার ট্যাংকার

হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় সমুদ্রের মাইনে আঘাত লেগে অন্তত চারটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) দেশটির পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আশ্বাসের মধ্যেই নতুন করে এমন ঘটনার খবর সামনে এল।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার অনুমোদনহীন দক্ষিণাঞ্চলীয় নৌপথ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করে। এ সময় জাহাজগুলো সমুদ্রের মাইনে আঘাত পায়। এতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং ট্যাংকারগুলোতে আগুন ধরে যায়।

আইআরজিসির দাবি, জাহাজ তিনটি তাদের রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল। একই সঙ্গে ইরানের নৌবাহিনীর দেওয়া সতর্কবার্তাও উপেক্ষা করে নির্ধারিত চলাচলপথের বাইরে দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে ঠিক কখন এসব ঘটনা ঘটেছে, ট্যাংকারগুলোর নাম কী কিংবা সেগুলো কোন দেশের পতাকাবাহী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি ইরান।

একই দিনে ইরানের সেনাবাহিনী হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চলে আরও একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ডের খবর জানায়। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, নিষিদ্ধ ও বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় অবৈধভাবে চলাচলের সময় জাহাজটি সমুদ্রের মাইনে আঘাত পায়। এতে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আগুন ধরে যায় এবং একপর্যায়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

এ নিয়ে হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক জাহাজের মাইনে আঘাত পাওয়ার খবর জানাল ইরান। তবে এসব ঘটনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন হরমুজ প্রণালির প্রধান নৌপথগুলো মাইনমুক্ত করার দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, গুরুত্বপূর্ণ চলাচলপথগুলো থেকে সমুদ্রের মাইন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাদের এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথটি সচল রাখা।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে আইআরজিসি। বৃহস্পতিবার সংগঠনটির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, কেবল বিবৃতি প্রকাশ করে হরমুজ প্রণালি মাইনমুক্ত করার দাবি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়—এমন প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান অব্যাহত রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র নৌপথটি নিরাপদ বলে দাবি করছে, অন্যদিকে ইরান সেখানে মাইন বিস্ফোরণ ও জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য সামনে আনছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে ইরান। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হয়। ফলে এখানে সামরিক উত্তেজনা কিংবা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, পণ্য পরিবহন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরানের মতো জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এই নৌপথ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। বিকল্প পথে এসব পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হলেও তা তুলনামূলক ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।

ইরানের পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে ওয়াশিংটন। রোববার সেন্টকম দাবি করে, গ্রীষ্মকাল থেকে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর ১৫০ কোটি ব্যারেল তেল রপ্তানিতে সহায়তা করেছে।

তবে সাম্প্রতিক মাইন বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের খবরের পর নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জাহাজ চলাচলের নির্ধারিত পথ, সমুদ্রের নিচে থাকা মাইনের অবস্থান এবং সামরিক বাহিনীগুলোর পাল্টাপাল্টি দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জাহাজের বিমা ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত ট্যাংকারগুলোর পরিচয়, হতাহতের সংখ্যা এবং মাইন বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।