বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিদেশ সফর শেষ হতে না হতেই দেশে শুরু হয় সফরের সাফল্য নিয়ে নানা আলোচনা। কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য কিংবা কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা এসবই স্বাভাবিকভাবে আলোচনায় আসতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা চোখে পড়ছে। বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশে যেসব বড় বড় ঘোষণা ও প্রচারণা শুরু হয়, তার কয়েকটির সত্যতা নিয়ে পরে সংশ্লিষ্ট দেশকেই প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর বিষয়টি ঘিরে পরপর দুটি ঘটনায় এই প্রবণতা সামনে এসেছে।
প্রথম ঘটনাটি জাপানকে ঘিরে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফরের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, জাপান প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে এক লাখ কর্মী নেবে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে এ-সংক্রান্ত পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করা হয়। সেখানে কারিগরি প্রশিক্ষণার্থী, নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীসহ বিভিন্ন পেশার জনশক্তি পাঠানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।
কিন্তু ২৯ অক্টোবর জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস সেক্রেটারি কিতামুরা তোশিহিরো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর এক লাখ কর্মী নেওয়ার বিষয়ে জাপান সরকারের সম্মতির খবর সঠিক নয়। এমনকি ২৭ অক্টোবর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠকেও এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিস্তারিত জানতে তিনি জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বৈঠকের আনুষ্ঠানিক বিবরণ দেখার পরামর্শ দেন।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বাংলাদেশ সরকার জাপানে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করতে পারে, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের জন্য আলোচনা চালাতে পারে, এমনকি নির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় কর্মী পাঠানোর উদ্যোগও নিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা আর জাপান সরকারের সেই সংখ্যক কর্মী গ্রহণে আনুষ্ঠানিক সম্মতি—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। একটি দেশের পরিকল্পনাকে অন্য দেশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার করার সুযোগ নেই।
অথচ একই বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। এই বিনিয়োগের ফলে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ জাপানে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর কোনো বার্ষিক কোটা ঘোষণা করা হয়নি; বরং বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলার কোনো কারণ নেই।
এর আগে মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম দাবি করেছিলেন, আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ কর্মী নেবে মালয়েশিয়া। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু মালয়েশিয়ার সরকারের মুখপাত্র দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিল বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেন। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আর. রামানানের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি জানান, বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া এই বক্তব্যকে মালয়েশিয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান বা সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। অর্থাৎ দুই লাখ কর্মী নেওয়ার যে ঘোষণা বাংলাদেশে প্রচারিত হয়েছিল, সেটিকে মালয়েশিয়া সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো আনুষ্ঠানিক ভিত্তি ছিল না।
এই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে।
প্রথমত, বিদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার এমন তাড়াহুড়ো কেন? কোনো আলোচনা শুরু হলেই সেটিকে চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে প্রচার করতে হবে কেন? সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্জন এবং পরিকল্পনাকে বিদেশি সরকারের সম্মতি হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়োজনটাই বা কী?
দ্বিতীয়ত, এসব ঘোষণা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দূতাবাস কিংবা কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে কি না? একটি দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা হওয়া এক বিষয়, আর সেই দেশের সরকার নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এই মৌলিক পার্থক্যটুকু যদি সরকারি পর্যায়েই স্পষ্ট না থাকে, তাহলে তার পরিণতি কী হতে পারে, জাপান ও মালয়েশিয়ার ঘটনাই তার উদাহরণ।
আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মাটিতে যখন এসব খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই দলীয় প্রচার-প্রচারণায় সেগুলোকে সরকারের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার যখন পরে সেই বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বা আনুষ্ঠানিকভাবে তা নাকচ করে, তখন বিব্রত হতে হয় শুধু কোনো প্রতিমন্ত্রী কিংবা প্রচারককে নয়; পুরো সরকারকেই।
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর কোনো দলের অভ্যন্তরীণ প্রচারণার বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কার্যক্রম। সফরে কী আলোচনা হলো, কোন বিষয়ে সমঝোতা হলো, কী চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো এবং কোন বিষয়গুলো এখনো সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে—এসব তথ্য যথাযথভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের বদলে যদি সফরকে ঘিরে অতিরঞ্জিত সাফল্যের বয়ান তৈরি করা হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর প্রকৃত অর্জনও বিতর্কের আড়ালে পড়ে যায়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির। বিদেশি সরকার যখন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো খবরের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বাধ্য হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা নির্ভরযোগ্য? বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিদেশি সরকার কতটা আনুষ্ঠানিক ও দায়িত্বশীল বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করবে?
বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারের উপকরণ নয়। এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের স্বপ্ন, পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং দেশের বৈদেশিক আয়ের প্রশ্ন জড়িত। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে অতীতে কর্মী শোষণ, ঋণদাসত্ব ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগও ছিল। এমন বাস্তবতায় নতুন শ্রমবাজার নিয়ে কোনো ঘোষণা দেওয়ার আগে আরও বেশি সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
সরকারের উচিত, বিদেশ সফরকে ঘিরে যেকোনো কর্মসংস্থানসংক্রান্ত ঘোষণা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নিশ্চিত করা। কোনটি আলোচনা, কোনটি পরিকল্পনা, কোনটি সমঝোতা স্মারক আর কোনটি চূড়ান্ত চুক্তি—তা জনগণের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা। একই সঙ্গে দলীয় প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রেও তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারণ রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতায় কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য শিরোনাম হওয়া যায়। কিন্তু বিদেশি সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সেই দাবি ভুল প্রমাণিত হলে যে কূটনৈতিক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার দায় শুধু প্রচারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের ওপর, সরকারের ওপর, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর ওপরও।
প্রশ্নটা তাই শুধু এক লাখ কিংবা দুই লাখ কর্মীর নয়। প্রশ্নটা হলো, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমরা কতটা দায়িত্বশীলভাবে কথা বলছি? দেশের মানুষের সামনে সাফল্যের গল্প বলার আগে সেই সাফল্যের বাস্তব ভিত্তি নিশ্চিত করার প্রয়োজন কি আমরা উপলব্ধি করছি?
জামিল আখতার একজন বাংলাদেশী যোগাযোগ পেশাজিবী। তিনি যোাগাযোগ ছাড়াও শিল্প, সাহিত্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ বিষয়ে লেখালেখি করেন।


