রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুর বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের জন্য তাঁকে এককভাবে দায়ী করা হচ্ছে, অথচ সে সময়কার আওয়ামী লীগ সরকারের নেতারাও এর দায় এড়াতে পারেন না। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমি বলির পাঁঠা’ এবং তাঁকে যেন ফাঁসানো না হয়।
তবে আবদুল হাইয়ের বক্তব্যের বিপরীতে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্তে উঠে আসা অনিয়মের চিত্র। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বিপুল অঙ্কের ঋণ যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিতরণ করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে আসে। এসব ঋণের বড় অংশ পরে খেলাপি হয়ে পড়ে। ফলে একসময় দেশের অন্যতম ভালো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বেসিক ব্যাংক আর্থিক সংকটে পড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ব্যাংকটিকে কয়েক হাজার কোটি টাকা দিতে হয়, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয়েছে জনগণকে।
একসময়ের সফল ব্যাংক, তারপর বিপর্যয়
১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি, যা বেসিক ব্যাংক নামে পরিচিত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা ব্যাংকটি দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শেখ আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার আগপর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার সাধারণত ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে ছিল। ২০০৮ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটি দেশের ভালো ব্যাংকগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হতো।
২০০৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শেখ আবদুল হাইকে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে সাধারণত শিল্পসচিব দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে আবদুল হাইয়ের নিয়োগ ছিল প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রম।
তিনি ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। এই প্রায় পাঁচ বছরে ব্যাংকটিতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটিকে আর্থিকভাবে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল অর্থের এই সহায়তাও ব্যাংকটির সংকট কাটাতে পারেনি।
আবদুল হাইয়ের নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের সময়কার ঘটনাবলি নিয়ে ব্যাংকটির সাবেক কর্মকর্তা, পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁদের কয়েকজনের দাবি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আবদুল হাইয়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে প্রভাবশালী মহল থেকে চাপ দেওয়া হতো। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ
আবদুল হাই একসময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে তিনি বাগেরহাট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা কমে যায়।
নিজের নিয়োগের পেছনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবদুল হাই জানান, ২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি ঢাকার বনানীর একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। সে সময়কার সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ ওই ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন এবং আবদুল হাই ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তাঁর দাবি, ওই সময়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তবে সেই যোগাযোগ কীভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি তিনি।
সাবেক সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবদুল হাই দাবি করেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং শেখ হাসিনাও তাঁকে পছন্দ করতেন না। কিন্তু ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজেদুর রহমানের বর্ণনায় ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
সাজেদুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আবদুল হাই ব্যাংকের নিয়মকানুন উপেক্ষা করতে শুরু করেন। তাঁর অভিযোগ, ব্যাংক ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগও ছিল না, কারণ এ বিষয়ে তাঁকে বারবার হুমকি দেওয়া হতো।
তিনি জানান, পরিস্থিতি সম্পর্কে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু সেখান থেকেও কার্যকর সহায়তার আশ্বাস পাননি। পরে গভর্নরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের বিষয়টি আবদুল হাই জেনে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
সাজেদুর রহমান আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫০ লাখ টাকা অনুদানের সিদ্ধান্ত নেয়। অনুদানের চেক দিতে আবদুল হাই তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গণভবনে গিয়েছিলেন। ওই ঘটনা বর্ণনা করে সাজেদুর রহমান শেখ হাসিনার সঙ্গে আবদুল হাইয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দাবি করেন।
ভবন কেনার চুক্তি ঘিরে বিতর্ক
বেসিক ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মের প্রাথমিক ঘটনাগুলোর একটি ছিল মতিঝিলে একটি নির্মাণাধীন ভবন কেনার চুক্তি। ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর পরিচালনা পর্ষদের সভায় আবদুল হাই ব্যাংকের নিজস্ব ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেন। এর কয়েক মাস পর, ২০১০ সালের ১ এপ্রিল, নির্মাণাধীন ভবনটি কেনার জন্য ৮১ কোটি টাকার চুক্তি করা হয়।
প্রস্তাবিত ভবনটির নাম রাখার কথা ছিল ‘জামান-বেসিক ব্যাংক টাওয়ার’। জমির মালিক ছিলেন সিঙ্কু আকরামুজ্জামান। তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিজনেস রিসোর্সেস লিমিটেডের ভবন নির্মাণের দায়িত্বও পাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ জমি বিক্রি ও নির্মাণকাজ—দুই ক্ষেত্রেই একই পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছিল।
চুক্তিটি নিবন্ধিত ছিল না। জমির মালিকানা নিয়েও বিরোধ ছিল এবং সম্পত্তিটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১২ সালের তদন্তে দেখা যায়, চুক্তির দিনই ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছিল। তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক নিরঞ্জন দেবনাথের মাধ্যমে এই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী দুই বছরে আরও কয়েক দফায় ৩৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ভবনটির জন্য পরিশোধ করা হয় ৭৬ কোটি টাকা।
কিন্তু এত অর্থ পরিশোধের পরও ব্যাংক ভবনটির পূর্ণ দখল পায়নি। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এবং মামলা চলমান থাকায় ভবনটি ব্যবহার করতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
নিরঞ্জন দেবনাথের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য গঠিত উপকমিটি জরুরি ভিত্তিতে ৪০ কোটি টাকা পরিশোধের সুপারিশ করেছিল। অন্যদিকে, আবদুল হাই অনিবন্ধিত চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, বিষয়টি তখনকার আইনজীবী ভালো বলতে পারবেন; তাঁর নিজের পুরোপুরি মনে নেই।
বেসিক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ভবন কেনার সিদ্ধান্ত, চুক্তি এবং অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে আবদুল হাইয়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটির বর্তমান চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ভবনটিতে কার্যক্রম স্থানান্তর করতে পারলে ভাড়া বাবদ ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।
ঋণ বিতরণে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, কমতে থাকে মুনাফা
আবদুল হাইয়ের চেয়ারম্যান থাকাকালে বেসিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণ দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু ঋণের পরিমাণ বাড়লেও ব্যাংকটির মুনাফা একই হারে বাড়েনি। বরং কয়েক বছরের ব্যবধানে মুনাফা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ব্যাংকটি লোকসানে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বেসিক ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। ২০১২ সালের মধ্যে তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। একই সময়ে ব্যাংকটির আয় ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।
মুনাফার হিসাবেও পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট। ২০১০ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল প্রায় ৬৬ কোটি টাকা। ২০১১ সালে তা বেড়ে প্রায় ৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু ২০১২ সালে মুনাফা নেমে আসে প্রায় ৩ কোটি টাকায়। ২০১৩ সালে ব্যাংকটি লোকসানে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে আর লাভের মুখ দেখতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ বিতরণ, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয়গুলো সামনে আসে। ব্যাংকিং খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, জামানতের বৈধতা, ঋণ পরিশোধের সম্ভাবনা এবং অর্থের ব্যবহার যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ না করা হলে ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থও ঝুঁকিতে পড়ে।
বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে তদন্তে উঠে আসা অনিয়মের বড় অংশই ছিল ঋণের নামে বিপুল অর্থ বিতরণকে কেন্দ্র করে। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের চিত্র সামনে আসে। বিভিন্ন শাখায় বিশেষ পরিদর্শন চালিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব অনিয়ম শনাক্ত করে।
সতর্কবার্তা দিয়েও থামানো যায়নি অনিয়ম
২০১২ সালের শেষ দিকে বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ পরিদর্শন শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগরসহ কয়েকটি শাখায় অনিয়ম ধরা পড়ে। ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আসার পর একাধিকবার সতর্ক করা হয় ব্যাংকটির কর্তৃপক্ষকে।
২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সতর্ক করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগেও চিঠি পাঠায়। এরপর ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও ঋণ অনিয়ম বন্ধ হয়নি।
২০১৩ সালের ১৮ আগস্ট তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে বৈঠক করেন। আবদুল হাইকে বৈঠকে উপস্থিত থাকতে বলা হলেও তিনি যোগ দেননি। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আরও কঠোর ভাষায় চিঠি পাঠায়। সেখানে ব্যাংকটির ঋণশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
আবুল মাল আবদুল মুহিত বিভিন্ন সময় বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ২০১৬ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে তিনি বলেছিলেন, জালিয়াতদের ধরতে নিজের দলের লোকেরাই বাধা দিচ্ছেন। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি এক সাক্ষাৎকারে তিনি আবদুল হাইয়ের ভূমিকা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, আবদুল হাইয়ের মতো একজন ব্যক্তি বেসিক ব্যাংককে ধ্বংস করে দিয়েছেন।
তৎকালীন একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ব্যাংকের পরিস্থিতি জানতে অর্থমন্ত্রী একবার তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সব শোনার পর মুহিত আবদুল হাইকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে ওই পরিচালক দাবি করেন।
পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ, চেয়ারম্যানের পদত্যাগ
পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকায় ২০১৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করে। একই মাসে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ায় চলে যাওয়ার অভিযোগও ওঠে।
এর দুই মাস পর, ২০১৪ সালের জুলাইয়ে, শেখ আবদুল হাই চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন। ৪ জুলাই তিনি তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাসায় গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরদিন ৫ জুলাই তাঁর মেয়াদের স্বাভাবিক সমাপ্তি হওয়ার কথা ছিল।
তবে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের অন্তত ৬৬টি মামলায় তিনি অভিযুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলার অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল পৃথক বিষয়; অভিযোগ থাকলেই কাউকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত বলা যায় না।
দেশ ছাড়ার পর কানাডায় থাকার দাবি
দীর্ঘদিন জনসমক্ষে অনুপস্থিত থাকার পর আবদুল হাইয়ের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশেই আছেন। কিন্তু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি সপরিবার কানাডায় অবস্থান করছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেই, ২০২৩ সালে, তিনি বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন। তবে ঠিক কোন মাসে দেশ ছাড়েন, তা আবদুল হাই জানাননি। বিদেশে অবস্থান করেও তিনি মুঠোফোনে নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব দিয়েছেন এবং নিজেকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর—বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের জন্য তিনি একা দায়ী নন। সে সময়কার রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায় ছিল বলে তিনি দাবি করেন। অন্যদিকে, ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও পরিচালকদের বর্ণনা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত এবং ঋণ বিতরণের পরিসংখ্যান তাঁর দায়িত্ব পালনকালীন ব্যাংকটির গভীর সংকটের চিত্র তুলে ধরে।
বেসিক ব্যাংকের এই ঘটনা কেবল একজন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি এবং অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ব্যাংকের অর্থ মূলত আমানতকারী ও রাষ্ট্রের সম্পদ। ঋণ অনিয়মের কারণে যখন কোনো ব্যাংক বিপর্যস্ত হয়, তখন তার ক্ষতি শুধু প্রতিষ্ঠানের হিসাবেই আটকে থাকে না; রাষ্ট্রীয় অর্থের সহায়তা প্রয়োজন হলে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের দায়ও জনগণের ওপর পড়ে। বেসিক ব্যাংকের ঘটনায় তাই দুর্নীতির অভিযোগের পাশাপাশি জরুরি হয়ে উঠেছে অর্থের প্রকৃত ব্যবহার শনাক্ত করা, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী অর্থ পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা নেওয়া।
আবদুল হাই নিজেকে ‘বলির পাঁঠা’ বললেও মূল প্রশ্নটি রয়ে গেছে: বেসিক ব্যাংকের বিপুল অর্থ কীভাবে অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা হলো, তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারল না কেন, আর রাষ্ট্রীয় অর্থে ব্যাংককে টিকিয়ে রাখার পরও দায় নির্ধারণ ও অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া কতটা এগিয়েছে? এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর নির্ভর করবে তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের স্বচ্ছ মূল্যায়নের ওপর।


