জাভির মতে, রোনালদিনহো ও নেইমারের ক্যারিয়ারে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা না থাকার পেছনে মূল কারণ ছিল তাঁদের মানসিকতা। বিশেষ করে বড় বড় শিরোপা জয়ের পর নতুন কিছু অর্জনের যে তাড়না একজন খেলোয়াড়কে সামনে এগিয়ে নেয়, সেটি তাঁরা ধরে রাখতে পারেননি। অন্যদিকে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও কখনো নিজেদের উন্নতির চেষ্টা বন্ধ করেননি।
২০০৫ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত অর্জনের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেয়েছিলেন রোনালদিনহো। এর আগে ও পরে বার্সেলোনার হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। তাঁর পায়ের জাদু, ড্রিবলিং, নিখুঁত পাস এবং গোল করার দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েছিল ফুটবল বিশ্ব। ২০০৬ সালে বার্সেলোনাকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা।
তবে তাঁর সেই সোনালি সময় খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একসময় ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় তারকাদের একজন হলেও ধীরে ধীরে পারফরম্যান্সে ভাটা পড়ে। মাঠের বাইরের জীবনযাপন, পার্টি এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জাভি মনে করেন, রোনালদিনহোর পতনের কারণ হিসেবে এসব বিষয়কে প্রধান করে দেখা ঠিক নয়।
বার্সেলোনায় একই সময়ে খেলার সুবাদে রোনালদিনহোকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল জাভির। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি মনে করেন, প্রয়োজনীয় সাফল্য অর্জনের পর ব্রাজিলিয়ান তারকার মধ্যে নতুন লক্ষ্য পূরণের আগ্রহ কিছুটা কমে গিয়েছিল।
এক সাক্ষাৎকারে জাভি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটি ছিল মানসিকতার সমস্যা। রোনালদিনহো সবকিছুই জিতেছিল। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং ব্যক্তিগতভাবে ব্যালন ডি’অরও। এরপর সম্ভবত তার মনে হয়েছিল, ঠিক আছে, আমার সবকিছুই অর্জন করা হয়ে গেছে।’
রোনালদিনহোর সঙ্গে মেসির মানসিকতার পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে জাভি আরও বলেন, সাফল্য পাওয়ার পরও আর্জেন্টাইন তারকার মধ্যে আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা ছিল। একটি অর্জন তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং প্রতিটি সাফল্যের পর নতুন লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছেন তিনি।
জাভির ভাষায়, ‘উদাহরণ হিসেবে যদি লিওর (মেসি) সঙ্গে তুলনা করেন, তাহলে রোনালদিনহোর মানসিকতা ছিল এমন, আমার কাজ শেষ। কিন্তু মেসি আরও বেশি কিছু চাইত। সে এগিয়ে যেতে থাকল, থামেনি। এর কারণ মানসিকতা, পার্টি নয়।’
মেসির ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে জাভির এই পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত সাফল্যেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। একাধিক ব্যালন ডি’অর জয়ের পরও তাঁর পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়েও বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে নিজের অর্জনের তালিকা আরও সমৃদ্ধ করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
জাভির বিশ্লেষণে শুধু রোনালদিনহো নন, একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল নেইমারের ক্যারিয়ারেও। বার্সেলোনায় মেসি ও লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছিলেন সময়ের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণত্রয়ী। তাঁদের সমন্বিত পারফরম্যান্সে ইউরোপীয় ফুটবলে একের পর এক প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে।
২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনার ট্রেবল জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল নেইমারের। ওই মৌসুমে লা লিগা, কোপা দেল রে ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে কাতালান ক্লাবটি। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও গোল করেছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। মেসি ও সুয়ারেজের সঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ। অনেকের ধারণা ছিল, সময়ের সঙ্গে তিনিই হয়ে উঠবেন বিশ্ব ফুটবলের প্রধান মুখ।
কিন্তু ২০১৭ সালে রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিস সাঁ-জার্মেইয়ে (পিএসজি) যোগ দেন নেইমার। তাঁর এই দলবদল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে। পিএসজিতে ব্যক্তিগতভাবে দারুণ কিছু পারফরম্যান্স দেখালেও চোট, অনিয়মিত উপস্থিতি এবং দলের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা তাঁর ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতাকে প্রভাবিত করে। ইউরোপীয় ফুটবলে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের যে প্রত্যাশা তাঁকে ঘিরে ছিল, তা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি পূরণ হয়নি।
নেইমারের ক্ষেত্রেও সাফল্যের পর নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন জাভি।
তিনি বলেন, ‘নেইমারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। বার্সেলোনায় তার দারুণ সময় কেটেছে, আমরা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছি। এরপর সে পিএসজিতে চুক্তিবদ্ধ হয়। এ ক্ষেত্রেও আমার মনে হয়, বিষয়টি মানসিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত।’
তবে জাভির বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে, রোনালদিনহো কিংবা নেইমারের প্রতিভা বা ফুটবলীয় দক্ষতার ঘাটতি ছিল। বরং তাঁর বিশ্লেষণে ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকার জন্য প্রতিভার পাশাপাশি প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিশ্রম, আত্মতৃপ্তি থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা।
এ প্রসঙ্গে মেসির পাশাপাশি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উদাহরণও টেনেছেন জাভি। তাঁর মতে, দুজনের মধ্যে একটি বড় মিল হলো—সাফল্য তাঁদের কখনো থামিয়ে দিতে পারেনি। বয়স, অর্জন কিংবা প্রতিযোগিতার পরিবর্তন সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।
জাভি বলেন, ‘যখন আপনি বুঝতে পারেন যে আপনার মানসিকতা নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, আপনার আগের সেই মানসিকতা আর নেই এবং আপনি আর আগের মতো খেলোয়াড় নন, তখন সমস্যা তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা মেসির ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। তারা দুজনই দানবের মতো।’
জাভির এই মন্তব্য ফুটবলে প্রতিভা ও মানসিক দৃঢ়তার মধ্যকার পার্থক্যকে নতুন করে সামনে এনেছে। একজন খেলোয়াড় অসাধারণ দক্ষতা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করতে পারেন, বড় ক্লাবের হয়ে শিরোপাও জিততে পারেন। কিন্তু সেই সাফল্য ধরে রাখা এবং আরও বড় অর্জনের জন্য নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রস্তুত রাখাই দীর্ঘমেয়াদি শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম শর্ত।
রোনালদিনহো ও নেইমার দুজনই নিজেদের সময়ে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন। তাঁদের অর্জনও কম নয়। তবে জাভির দৃষ্টিতে মেসি ও রোনালদোকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে তাঁদের অদম্য মানসিকতা—সাফল্য পাওয়ার পরও আরও কিছু অর্জনের ক্ষুধা কখনো হারিয়ে না ফেলা।


