দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। বছরের শেষভাগে এসেও কমছে না মশাবাহিত এ রোগের প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৭০ জন। ফলে চলতি বছরের ২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩৩ জনে। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার।
সোমবার (২ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের আটটি বিভাগেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০০ জন, যা এক দিনে সারা দেশে ভর্তি হওয়া মোট রোগীর উল্লেখযোগ্য অংশ।
ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে। সেখানে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ২৯৪ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ২৫২ জন এবং বরিশাল বিভাগে ১৮৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১৫৩ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৫ জন, রংপুর বিভাগে ৭১ জন এবং সিলেট বিভাগে ২২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন।
বিভাগভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর সংক্রমণ কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের সব বিভাগেই রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা ঘটছে। তবে ঢাকা বিভাগে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৯ জন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৯ জন। একই সময়ে এ রোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ছয়জনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেড়েছে।
তবে আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ৪৯৯ জন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬ হাজার ১৭ জন ডেঙ্গু রোগী।
সংক্রমণের এই ব্যাপকতা চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানো, প্রয়োজনীয় শয্যা নিশ্চিত করা এবং জটিল রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না। তবে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
তিন বছরের পরিসংখ্যানে ডেঙ্গুর ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার জনস্বাস্থ্য খাতে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ওই বছর মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের।
২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যান ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। ওই বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ৪১৩ জনের।
চলতি বছরের ২ নভেম্বর পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের দুই বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসের বেশি সময়েই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হয়েছে।
বছরভিত্তিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—
| বছর | হাসপাতালে ভর্তি রোগী | মোট মৃত্যু |
|---|---|---|
| ২০২৩ | ৩,২১,১৭৯ | ১,৭০৫ |
| ২০২৪ | ১,০১,২১৪ | ৫৭৫ |
| ২০২৫ | ১,০২,৮৬১ | ৪১৩ |
| ২০২৬ (২ নভেম্বর পর্যন্ত) | ১,৩৮,৮৯৯ | ৪৩৩ |
এই পরিসংখ্যান বলছে, ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের জন্য মৌসুমি স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে। সংক্রমণের ধরন, মশার বংশবিস্তার এবং নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশগত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জোর দেওয়ার তাগিদ
ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায় এডিস মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা। সাধারণত জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এ মশা ডিম পাড়ে। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টবের নিচের পাত্র, অব্যবহৃত বালতি, ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা পানি জমে থাকা বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার প্রজনন হতে পারে।
এ কারণে শুধু মশা নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নিয়মিত জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, হাসপাতাল, নির্মাণাধীন ভবন ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা উচিত নয়। বিশেষ করে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে বলে এ সময় সতর্ক থাকা জরুরি।
সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন
ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
চলতি বছরের সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। রোগীর সংখ্যা কমাতে হলে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে সারা বছর ধরে চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে নাগরিক সচেতনতা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও প্রাণহানির ঝুঁকি মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।



