দেশে হামের সংক্রমণ ও উপসর্গজনিত অসুস্থতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৫৪৮ শিশু। আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে ১০৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১ হাজার ১৫২ শিশু। সব মিলিয়ে নিশ্চিত হাম এবং হামের উপসর্গজনিত কারণে প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ২৫৭ শিশু।
সোমবার (২ নভেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, রোববার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল, রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশের আট বিভাগেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে নতুন রোগীর সংখ্যা ৬২৫। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩১১ শিশু ভর্তি হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। বরিশালে ১৫০, সিলেটে ১৪৫, খুলনায় ১২৫, ময়মনসিংহে ১০২, রাজশাহীতে ৪৬ এবং রংপুরে ৩৯ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গজনিত অসুস্থতা ছড়িয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ২ লাখ ৬ হাজার ১৬৮ শিশু। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪৮ শিশু। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক শিশু হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও নতুন রোগী ভর্তির ধারাবাহিকতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
এদিকে, একই সময়ের মধ্যে দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩১ হাজার ৫০৫। তাদের মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ২৩ হাজার ৯৯১ শিশুর শরীরে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, সন্দেহভাজন রোগীদের একটি অংশের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে। তবে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা এবং নিশ্চিত সংক্রমণের পরিসংখ্যান এক নয়—এ দুটি হিসাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে নির্গত ক্ষুদ্র জলকণার সংস্পর্শে এ ভাইরাস ছড়ায়। প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জ্বরের কয়েক দিন পর মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে হাম কখনো কখনো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন শিশু এবং পর্যাপ্ত টিকা না পাওয়া শিশুদের ঝুঁকি বেশি।
হাম প্রতিরোধে টিকাদান সবচেয়ে কার্যকর উপায়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত বয়সে শিশুদের হামের টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কোনো শিশুর জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সন্দেহজনক রোগীকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে সাময়িকভাবে আলাদা রাখাও সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হিসাব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা এবং টিকাদানের আওতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, যাতে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করা যায় এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।


