চৌদ্দগ্রামে দুই শিশুশিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে শিক্ষক গ্রেপ্তার

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে একটি আবাসিক হাফেজিয়া মাদ্রাসার ১০ ও ১১ বছর বয়সী দুই শিশুশিক্ষার্থীকে একাধিকবার ধর্ষণের অভিযোগে মো. কবির হোসেন নামের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওই মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় তাঁর বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী দুই শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে চৌদ্দগ্রাম থানায় পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।

গত রোববার রাতে উপজেলার একটি হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করা হয়। পরে সোমবার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কবির হোসেনের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায়। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক মাস আগে ওই মাদ্রাসার আবাসিক শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন কবির হোসেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের দুই আবাসিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক আচরণ শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দুই শিশুর বয়স যথাক্রমে ১০ ও ১১ বছর। তাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং নানা ধরনের প্রলোভন দিয়ে কয়েক দিন ধরে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালান।

শিশুদের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত শিক্ষকের ভয়ে এবং লোকলজ্জার আশঙ্কায় তারা প্রথমদিকে কাউকে কিছু জানায়নি। মাদ্রাসার আবাসিক পরিবেশে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থাকার কারণে তাদের পক্ষে বিষয়টি প্রকাশ করাও সহজ ছিল না। তবে গত দুই-তিন দিনে নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে গেলে শেষ পর্যন্ত তারা পরিবারের সদস্যদের কাছে সবকিছু খুলে বলে।

শিশুদের কাছ থেকে ঘটনা জানার পর দুই পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন। পরে অভিযোগটি স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে মাদ্রাসার অন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দেয়। একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

মাদ্রাসা ঘেরাও করে শাস্তির দাবি

ঘটনার প্রতিবাদে গত রোববার বিকেলে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে জড়ো হন ভুক্তভোগী শিশুদের স্বজন, অন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। একপর্যায়ে তাঁরা মাদ্রাসাটি ঘেরাও করে অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পরিস্থিতি সম্পর্কে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে চৌদ্দগ্রাম থানার একটি দল ঘটনাস্থলে যায়।

পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত কবির হোসেনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। এ সময় মাদ্রাসা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও পুলিশ তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ভুক্তভোগী দুই শিশুর বাবা প্রবাসে থাকেন। এ কারণে তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে একজনের চাচা এবং অন্যজনের দাদা বাদী হয়ে চৌদ্দগ্রাম থানায় পৃথক দুটি মামলা করেন। মামলাগুলোতে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুদের ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার দেখায়।

পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের বিষয়

চৌদ্দগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আরিফ হোছাইন সোমবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নেয় এবং অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন বলে জানান ওসি। তাঁর বিরুদ্ধে দুই শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। তাঁকে আদালতে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় মাদ্রাসার আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং শিশুদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, তা আবারও সামনে এসেছে।

শিশুরা অনেক সময় ভয়, লজ্জা কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির হুমকির কারণে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে তাদের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, আতঙ্ক কিংবা হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের ক্ষেত্রে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং তাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চৌদ্দগ্রামের এই ঘটনায় দুই শিশুর পরিবারের করা পৃথক মামলার তদন্তের মধ্য দিয়ে অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আইন অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।