২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের ঢালাওভাবে ‘রাজাকারের সন্তান’ আখ্যা দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর আক্তারুজ্জামান এখন জামায়াতে ইসলামীর কাছে অন্যতম প্রিয় মুখ বা ‘হিরো’ হিসেবে পরিণত হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রাশেদ খান। তার মতে, ঘটনার এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মূলত ২০২৪ সালের বিতর্কিত মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য আলোচিত একটি দল ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে।
সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বিস্তারিত স্ট্যাটাসে রাশেদ খান এই তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক বার্তা প্রকাশ করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই পোস্টে রাশেদ খান জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি স্মরণ করে উল্লেখ করেন, আন্দোলন চলাকালে ‘ফেস দ্য পিপল’ নামের একটি জনপ্রিয় অনলাইন টকশোতে অংশ নিয়েছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর আক্তারুজ্জামান। ওই অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত থেকে রাশেদ খান নিজে সেই আলোচনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, সেই টকশোতে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে মেজর আক্তারুজ্জামান আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে সম্বোধন করেন। সেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে, রাজাকারের সন্তান এবং জামায়াত-শিবিরের কর্মীরাই মূলত এই আন্দোলন পরিচালনা করছে।
রাশেদ খান আরও স্পষ্ট করেন, অনুষ্ঠান চলাকালে উপস্থাপক সাগর যখন মেজর আক্তারুজ্জামানকে পুনরায় প্রশ্ন করেছিলেন—আন্দোলনরত সবাই কি সত্যিই রাজাকারের সন্তান? তখন মেজর আক্তারুজ্জামান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন যে, তারা শতভাগ রাজাকারের সন্তান।
জুলাই আন্দোলনের সময়কার সেই বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টেনে রাশেদ খান বলেন, যিনি তৎকালীন গণ-অভ্যুত্থানের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং আন্দোলনকারীদের প্রতিনিয়ত খাটো করেছেন, তিনি বর্তমানে রাজনৈতিক রঙ বদলে জামায়াতের রাজনীতিতে স্বাচ্ছন্দ্যে যুক্ত হয়ে গেছেন। জামায়াতকে অতীতে বিভিন্ন সময়ে কড়া ভাষায় আক্রমণ করা সেই আক্তারুজ্জামান এখন ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দেওয়া শিখে নিজেকে রাজনীতির মাঠে জনপ্রিয় প্রমাণ করতে চাইছেন। এই পরিবর্তনকে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা নয়, বরং সুযোগসন্ধানী ও ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক সচেতন মহল। একই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ও নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাশেদ খান ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি প্রদান এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর আক্তারুজ্জামান। পরবর্তীতে তিনি জামিনে মুক্তি পেলে জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুলেল সংবর্ধনা জানান। এমনকি সংবর্ধনা প্রদানকালে জামায়াত আমিরের দাবি ছিল, আক্তারুজ্জামান কারও গায়ে হাত তোলেননি এবং তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া বা মারধরের অভিযোগে করা মামলাটি সম্পূর্ণ সাজানো ও মিথ্যা।
জামায়াত নেতাদের এই সংবর্ধনা প্রদান ও সমর্থনের ঘটনাকে তীব্র ভাষায় খোঁচা দিয়ে রাশেদ খান জানান, সাধারণ মানুষ এই পুরো নাটকীয়তা দেখে মন্তব্য করছে যে চব্বিশের বিতর্কিত চরিত্রকে একাত্তরের বিতর্কিত রাজনৈতিক শক্তি ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে মেজর আক্তারুজ্জামান জামায়াত আমিরের পাশে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রসঙ্গ টেনে এনে বক্তব্য দেন। তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের উদাহরণ দিয়ে মন্তব্য করছিলেন। সেই পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে রাশেদ খান হাস্যরসের ছলে লেখেন, আক্তারুজ্জামান একাত্তরের প্রসঙ্গ তুলে বক্তব্য দেওয়ার সময় হয়তো জামায়াত নেতাদের কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে, কারণ তাঁকে নিয়ে প্রশংসার বন্যা ভাসালেও তিনি এখনো একাত্তরের ইতিহাস টেনে আনছেন।
সমগ্র ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশের বর্তমান রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল রূপ এবং রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতার দৈন্যদশাই ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।


