ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো আন্দোলনে নেমেছেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে সদর উপজেলার কাঠেরপুল এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় আন্দোলনস্থল ও আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সকাল ১০টার দিকে কাঠেরপুল এলাকায় কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা জড়ো হয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ তাঁদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা বাড়ে এবং শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
সকাল ১০টা থেকে বেলা পৌনে ১২টা পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নেয়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, আন্দোলনে বাধা
ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় এক দোকানি জানান, পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা জড়ো হওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে।
অন্যদিকে মেট্রো নিটিংয়ের এক শ্রমিক অভিযোগ করেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন। এ সময় বিএনপির নেতারা এসে শ্রমিকদের মারধর করেন বলে তাঁর দাবি।
শ্রমিকদের অভিযোগ, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে তাঁদের কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দিয়েছে। তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানাতে চাইলেও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেছে বলে দাবি করেন আন্দোলনকারীরা।
তবে সংঘর্ষের সূত্রপাত এবং শ্রমিকদের ওপর মারধরের অভিযোগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ফলে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পুলিশের বক্তব্য, জনদুর্ভোগ ঠেকাতে পদক্ষেপ
পুলিশের দাবি, গত দুই দিন ধরে শ্রমিকদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও তাঁরা বিভিন্ন ব্যক্তির উসকানিতে বারবার সড়কে নেমে অবরোধ সৃষ্টি করছেন। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সড়কে যানজট ও জনদুর্ভোগের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, সকাল থেকেই বিশৃঙ্খলা এড়াতে ঘটনাস্থলে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং এসআরবির সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। প্রথমে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরিসংক্রান্ত দাবি পর্যালোচনার জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত আসার পর আন্দোলনের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাঁদের অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিকেরা সেই অনুরোধ না মেনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে ওঠার চেষ্টা করেন।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও জানান, শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
আন্দোলনে চারজন আটক, কারখানা বন্ধের ঘোষণা নেই
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, আন্দোলন থেকে এখন পর্যন্ত চারজনকে আটক করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়নি।
শ্রমিকদের দাবি, মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত না আসায় তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, জনসাধারণের চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
টানা তিন দিনের আন্দোলনে বাড়ছে উত্তেজনা
এর আগে সোমবার ও মঙ্গলবারও একই দাবিতে ফতুল্লার বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তাঁদের কর্মসূচির কারণে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
শ্রমিকদের বর্তমান আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দাবি, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। তবে তাঁদের দাবির পক্ষে কী ধরনের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, কিংবা মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত কবে আসতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত। এ খাতে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের প্রশ্নটি একদিকে যেমন তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, অন্যদিকে তেমনি উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে গেলে শ্রমিকদের প্রকৃত আয় ও জীবনযাত্রার ওপর চাপ তৈরি হয়। এ কারণে মজুরি নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিলে তার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান শ্রমিক এবং কারখানা কর্তৃপক্ষ—উভয় পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
ফতুল্লায় টানা তিন দিনের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। তবে শ্রমিকদের দাবি নিয়ে আলোচনা ও মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য সামনে না এলে আন্দোলন পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত। একই সঙ্গে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাঁদের দাবি শোনার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


