বিশ্ব অর্থনীতির জগতে মানবিকতার এক উজ্জ্বল নাম অমর্ত্য সেন।
অর্থনীতিকে যিনি কেবল আয়-ব্যয়, উৎপাদন কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, মর্যাদা, সমতা ও কল্যাণের সঙ্গে অর্থনীতির গভীর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি একাধারে বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক, চিন্তাবিদ ও মানবকল্যাণের একনিষ্ঠ প্রবক্তা।
আজ ৩ নভেম্বর, এই প্রথিতযশা মনীষীর জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল আন্তরিক অভিনন্দন, শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত শুভকামনা।
জন্ম ও শৈশব
অমর্ত্য কুমার সেনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে। তাঁর পিতা আশুতোষ সেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক। মা অমিতা সেন। তাঁর মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং শান্তিনিকেতনের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও শিক্ষাবিদ।
তাঁর পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের মাটিতে প্রোথিত। তাঁদের আদি নিবাস ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকা শহরের পুরান ঢাকার ওয়ারীতে। পিতার কর্মসূত্রে শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় তিনি ঢাকায় কাটিয়েছেন। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাঙ্গনে বেড়ে ওঠা তাঁর চিন্তা ও মননকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মুক্তবুদ্ধির পরিবেশ তাঁর মানসগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
শিক্ষা ও কর্মজীবন
অমর্ত্য সেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৫৯ সালে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকস, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।
১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ট্রিনিটি কলেজের মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এই কলেজের প্রথম ভারতীয় প্রধান ছিলেন।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টমাস ডব্লিউ ল্যামন্ট ইউনিভার্সিটি প্রফেসর এবং অর্থনীতি ও দর্শন বিভাগের অধ্যাপক। একই সঙ্গে তিনি হার্ভার্ড সোসাইটি অব ফেলোসের সিনিয়র ফেলো।
অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক অবদান
অমর্ত্য সেনের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে কল্যাণ অর্থনীতি, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, সামাজিক পছন্দ তত্ত্ব, মানব উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ন্যায়বিচার ও জনকল্যাণ।
১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation বিশ্বব্যাপী দুর্ভিক্ষ গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়।
এই গবেষণায় তিনি দেখিয়েছেন, দুর্ভিক্ষের জন্য শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতিই দায়ী নয়; মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার, ক্রয়ক্ষমতা, সম্পদের অসম বণ্টন এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাও দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ, একটি দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত থাকলেও সঠিক বণ্টনব্যবস্থা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। তাঁর এই বিশ্লেষণ অর্থনীতির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
মানব উন্নয়ন তত্ত্বেও তাঁর অবদান অসামান্য। তাঁর সক্ষমতা বা Capability Approach তত্ত্বে তিনি দেখিয়েছেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয় কিংবা জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বিচার করা যায় না। বরং মানুষ কতটা সুস্থভাবে বাঁচতে পারছে, শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে এবং নিজের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে পারছে—এসবই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড।
মানব উন্নয়ন সূচক ও তাঁর অবদান
মানব উন্নয়ন সূচক বা Human Development Index (HDI) প্রবর্তনের পেছনে অমর্ত্য সেনের চিন্তাভাবনা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানি অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হকের সঙ্গে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতা মানব উন্নয়নের ধারণাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
১৯৯০ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) প্রথম মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে মানব উন্নয়ন সূচককে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই সূচকে একটি দেশের মানুষের গড় আয়ু, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে বিশ্বকে তিনি ও তাঁর সমসাময়িক চিন্তাবিদেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন—উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন।
নোবেল পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
অর্থনীতি ও মানবকল্যাণে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৮ সালে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর পুরস্কারের মূল কারণ ছিল কল্যাণ অর্থনীতিতে যুগান্তকারী অবদান।
১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশটির সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করে।
এ ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ মেডেল, ফ্রান্সের লেজিয়ঁ দনর, যুক্তরাজ্যের অনারারি কম্প্যানিয়ন অব অনারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননা অর্জন করেছেন।
২০১১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ মেডেল লাভ করেন। অর্থনীতি, দর্শন, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর বহুমাত্রিক অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হয়েছে।
তিনি ইকোনমেট্রিক সোসাইটি, ইন্ডিয়ান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন, আমেরিকান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
লেখক ও চিন্তাবিদ অমর্ত্য সেন
অমর্ত্য সেন কেবল একজন গবেষক বা শিক্ষক নন, তিনি একজন প্রভাবশালী লেখকও। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত বইগুলো বিশ্বের ৩০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. Poverty and Famines
২. Development as Freedom
৩. The Idea of Justice
৪. The Argumentative Indian
৫. Identity and Violence
৬. Collective Choice and Social Welfare
তাঁর লেখায় অর্থনীতির সঙ্গে দর্শন, নৈতিকতা, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের এক অসাধারণ সমন্বয় ঘটেছে।
বিশেষ করে Development as Freedom গ্রন্থে তিনি উন্নয়নকে মানুষের স্বাধীনতা সম্প্রসারণের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, ক্ষুধা, অশিক্ষা, অসুস্থতা, বৈষম্য ও সামাজিক বঞ্চনা থেকে মানুষকে মুক্ত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত হতে পারে।
বিশ্বমানবতার প্রতি তাঁর বার্তা
অমর্ত্য সেনের চিন্তাভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি অর্থনীতিকে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেননি। তাঁর কাছে উন্নয়নের অর্থ কেবল বড় বড় সেতু, শিল্পকারখানা, প্রবৃদ্ধির হার কিংবা জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যান নয়; বরং একজন দরিদ্র মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, একটি শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, একজন নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রতিটি মানুষের জন্য সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করাই প্রকৃত উন্নয়ন।
তিনি বিশ্বাস করেন, দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; দারিদ্র্য মানুষের সম্ভাবনা, স্বাধীনতা ও পছন্দের সুযোগকে সংকুচিত করে। তাই মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, গণতন্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সমান সুযোগ।
বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক এবং শৈশবের স্মৃতি তাঁকে আমাদের কাছেও বিশেষভাবে আপন করে তুলেছে। বিশ্বমঞ্চে তাঁর অর্জন শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের নয়, বাংলা ভাষা ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যেরও এক অনন্য গৌরব।
জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও শুভকামনা
পৃথিবীর বহু খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব কষেছেন; কিন্তু অমর্ত্য সেন সেই হিসাবের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন মানুষকে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়, বরং সেই দেশের মানুষের সুস্থতা, শিক্ষা, স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মর্যাদা।
তাঁর চিন্তা ও গবেষণা প্রমাণ করেছে, অর্থনীতি যখন মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই তা মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
জন্মদিনে বিশ্ববরেণ্য এই বাঙালি মনীষীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক অভিনন্দন।
দীর্ঘায়ু হোন, সুস্থ থাকুন। আপনার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মানবিক দর্শন ও চিন্তার আলো আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করুক।
শুভ জন্মদিন, অধ্যাপক অমর্ত্য সেন।



