দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে দেশে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহককে ব্যয় করতে হচ্ছে ২ হাজার ৬০ টাকা। অথচ একই পরিমাণ গ্যাসের জন্য ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের গ্রাহকদের তুলনামূলকভাবে কম অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। রান্নার কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এই জ্বালানির উচ্চমূল্য বাংলাদেশের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) দেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নতুন এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সিলিন্ডারপ্রতি বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার জন্য সম্পূর্ণভাবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক ব্যয়ে এর সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের দামের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১২ কেজি এলপিজির সমপরিমাণ গ্যাসের দাম পাকিস্তানে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৫৮৩ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১ হাজার ৫৬৭ টাকা এবং নেপালে ১ হাজার ৪২৬ টাকা। ভারতের কলকাতায় একই পরিমাণ গ্যাসের দাম প্রায় ১ হাজার ৭২ টাকা। অর্থাৎ, কলকাতার তুলনায় বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপিজি কিনতে প্রায় ৯৮৮ টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দামের ব্যবধান
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এলপিজি সিলিন্ডারের প্রচলিত ওজন এক নয়। ভারত ও নেপালে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১৪ দশমিক ২ কেজির সিলিন্ডার। পাকিস্তানে প্রচলিত সিলিন্ডারের ওজন ১১ দশমিক ৮ কেজি, শ্রীলঙ্কায় সাড়ে ১২ কেজি এবং বাংলাদেশে ১২ কেজি। ফলে সরাসরি সিলিন্ডারপ্রতি দামের তুলনা করলে প্রকৃত ব্যবধান বোঝা কঠিন। এ কারণে প্রতিটি দেশের মূল্যকে ১২ কেজি গ্যাসের সমপরিমাণ ধরে হিসাব করা হয়েছে।
| দেশ বা শহর | প্রচলিত সিলিন্ডারের ওজন | সিলিন্ডারের মূল্য | ১২ কেজি গ্যাসের আনুমানিক মূল্য (বাংলাদেশি টাকা) |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ১২ কেজি | ২,০৬০ টাকা | ২,০৬০ টাকা |
| ভারত, কলকাতা | ১৪.২ কেজি | ৯৬৮ রুপি | ১,০৭২ টাকা |
| ভারত, দিল্লি | ১৪.২ কেজি | ৯৪২ রুপি | কলকাতার তুলনায় কম |
| নেপাল | ১৪.২ কেজি | ২,০৬০ নেপালি রুপি | ১,৪২৬ টাকা |
| শ্রীলঙ্কা | ১২.৫ কেজি | ৪,৩৬৫ রুপি | ১,৫৬৭ টাকা |
| পাকিস্তান | ১১.৮ কেজি | ৩,৪৭০ রুপি | ১,৫৮৩ টাকা |
দ্রষ্টব্য: বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময় হার ও সিলিন্ডারের আকার বিবেচনায় মূল্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন শহর ও বাজারে প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ভিন্ন হতে পারে।
ভারতের সরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান অয়েলের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লিতে ১৪ দশমিক ২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৯৪২ রুপি এবং কলকাতায় ৯৬৮ রুপি। এসব মূল্যকে ১২ কেজি গ্যাসের সমপরিমাণে রূপান্তর করলে কলকাতার বাজারে দাম বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম থাকে।
ভারতে স্বল্প আয়ের গ্রাহকদের জন্য এলপিজি সিলিন্ডারপ্রতি ৩০০ রুপি ভর্তুকির ব্যবস্থাও রয়েছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একজন গ্রাহক বছরে সর্বোচ্চ চারবার এই সুবিধা নিতে পারেন। এর জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে নিবন্ধন করতে হয়। তবে কলকাতার ১২ কেজি এলপিজির প্রায় ১ হাজার ৭২ টাকার যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা সিলিন্ডারের ঘোষিত মূল্যের ভিত্তিতে; ভর্তুকির সুবিধা বাদ দিয়ে প্রকৃত ব্যয় আরও কমতে পারে।
নেপালের সরকারি প্রতিষ্ঠান নেপাল অয়েল করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১৪ দশমিক ২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ নেপালি রুপি। ১২ কেজির সমপরিমাণ গ্যাসের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৪২৬ টাকা। ফলে নেপালেও একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম অর্থ ব্যয় হয়।
শ্রীলঙ্কার সরকারি প্রতিষ্ঠান লিট্রো গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪ হাজার ৩৬৫ রুপি। সেই হিসাবে ১২ কেজি এলপিজির মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫৬৭ টাকা। অন্যদিকে পাকিস্তানের তেল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১১ দশমিক ৮ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ৪৭০ রুপি। সমপরিমাণ গ্যাসের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৫৮৩ টাকা।
বাংলাদেশের বাজারে দাম বেশি কেন
বাংলাদেশে এলপিজির দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ার পেছনে আমদানি ও পরিবহন ব্যয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণে আমদানিনির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য, জাহাজভাড়া, বন্দরসংক্রান্ত খরচ এবং ডলার বিনিময় হারের পরিবর্তন স্থানীয় বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। আমদানির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তামূল্যে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নভেম্বরের মূল্য নির্ধারণে প্রতি টন এলপিজির পরিবহন ব্যয় ও আমদানিকারকের প্রিমিয়াম বাবদ ২৫০ ডলার ধরা হয়েছে। তবে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে একই ধরনের ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে শুধু আমদানি ও পরিবহন ব্যয়কে বাংলাদেশের উচ্চমূল্যের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। কর, বাজারব্যবস্থা, বিতরণব্যয়, সরকারি নীতি ও ভর্তুকির পার্থক্যও মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা ও পরিবেশকের ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। আমদানির পর সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং খুচরা পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রতিটি ধাপে ব্যয় যুক্ত হয়। এসব ব্যয়ের কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় দেশভেদে পার্থক্য থাকায় একই পরিমাণ গ্যাসের দামও এক রকম হয় না।
নির্ধারিত দামের বাইরে বিক্রির অভিযোগ
সরকারি বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে সব সময় সেই দামে এলপিজি পাওয়া যায় না। চাহিদা বেড়ে গেলে স্থানীয় বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। ফলে ঘোষিত মূল্য এবং ভোক্তার প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি জ্বালানির বাজারদরের বিষয় নয়; এর সঙ্গে পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ও জড়িত। শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বহু পরিবার এলপিজি ব্যবহার করে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ নেই, সেখানে রান্নার অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই সিলিন্ডার। দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের বাজেটে বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনামূলক মূল্যচিত্র থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে এলপিজির দাম কমানোর সম্ভাবনা যাচাই করতে হলে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারদর পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। আমদানি, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিতরণব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব, বাজারে প্রতিযোগিতা এবং নির্ধারিত মূল্য কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর ভর্তুকি ও মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের ভোক্তাদের ব্যয় কমানোর সম্ভাব্য পথ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।


