স্মরণ – স্মৃতিতে ভাস্বর বাংলার-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শ্যামল ভট্টাচার্য

কিছু মানুষ কেবল নিজের জীবন অতিবাহিত করেন না, তাঁরা তাঁদের কর্ম, মেধা, মনন ও আদর্শ দিয়ে আলোকিত করে যান একটি জনপদ, একটি সমাজ এবং কয়েক প্রজন্মের মানুষকে। শ্যামল রঞ্জন ভট্টাচার্য ছিলেন তেমনই একজন আলোকিত মানুষ।

বগুড়ার শিক্ষা, সাহিত্য ও নাট্যাঙ্গনের এক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাগুরু এবং সংস্কৃতিচর্চার এক উজ্জ্বল পথিকৃৎ।

তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, নাট্যকার, অভিনেতা, সংগঠক ও সমাজমনস্ক মানুষ। পেশাগত জীবনে বগুড়া জিলা স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক হলেও তাঁর কর্মপরিধি কখনোই শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষা, সংস্কৃতি, নাট্য আন্দোলন এবং সমাজের অগ্রগতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন সৃজনশীলতার স্বাক্ষর।

জন্ম ও শৈশব

শ্যামল রঞ্জন ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৩৯ সালের ১০ আগস্ট বগুড়ায়। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন চিন্তাশীল, সমাজসচেতন ও সংস্কৃতিমনস্ক। কৈশোরেই তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সমাজ পরিবর্তনের প্রত্যয়।

মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে বগুড়ায় প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে মিছিল বের করেছিলেন তিনি। বয়সে কিশোর হলেও মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে তাঁর সেই সাহসী ভূমিকা ছিল অসাধারণ।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজ মহল্লা জলেশ্বরীতলার নিরক্ষর মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে সহপাঠীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন একটি নৈশ বিদ্যালয়। দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটির পাঠাগার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান।

কৈশোর থেকেই শিক্ষা, প্রগতিশীল চিন্তা ও সমাজ পরিবর্তনের যে স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন, পরবর্তী জীবনে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

শিক্ষকতা ও কর্মজীবন

ডিপ্লোমা প্রকৌশলী শ্যামল রঞ্জন ভট্টাচার্য শিক্ষকতা পেশায় আসার আগে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন প্রকৌশলী হিসেবে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর তৎকালীন গ্রেটার চিটাগাং ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তীতে জীবনের লক্ষ্য ও আগ্রহের জায়গা থেকে বেছে নেন শিক্ষকতার মহান পেশা।

১৯৬৭ সালের ১৬ জানুয়ারি বগুড়া জিলা স্কুলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টস বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি সংস্কৃত এবং আরবি ভাষাতেও তাঁর ছিল অসাধারণ দক্ষতা।

শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ নয়, শিক্ষার্থীদের মননশীলতা, নৈতিকতা, সাহিত্যবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার প্রতিও ছিল তাঁর বিশেষ মনোযোগ। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন প্রিয় শিক্ষক, আর সহকর্মীদের কাছে ছিলেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের এক অনন্য উদাহরণ।

প্রায় ৩৩ বছর শিক্ষকতা শেষে ২০০০ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসর তাঁর কর্মমুখর জীবনে কখনোই ছেদ টানতে পারেনি। শ্রেণিকক্ষের বাইরে থেকেও তিনি আজীবন শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।

বগুড়ায় জ্ঞানচর্চা ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যাত্রা

শিক্ষার আলো সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন শ্যামল ভট্টাচার্য। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি আলোকিত সমাজ গড়তে হলে বই পড়ার অভ্যাস, মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের কোনো বিকল্প নেই।

তাঁরই উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় বগুড়ায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি, মননশীলতা বিকাশ এবং সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর এই উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চেয়েছেন মানুষ জ্ঞানী হোক, যুক্তিবাদী হোক, সংস্কৃতিমনস্ক হোক। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে আলোকিত করার যে ব্রত তিনি কৈশোরে গ্রহণ করেছিলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই ব্রত থেকে বিচ্যুত হননি।

নাট্য আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক

শ্যামল রঞ্জন ভট্টাচার্যের আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন বগুড়ার নাট্য আন্দোলনের অন্যতম প্রাণপুরুষ।

শিক্ষকতার পাশাপাশি নাটক রচনা, অভিনয় ও নাট্য সংগঠনের কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। বগুড়া ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করেছেন। তাঁর রচিত নাটকও মঞ্চস্থ হয়েছে বিভিন্ন স্থানে।

১৯৭২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বগুড়া নাট্য গোষ্ঠী’। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বগুড়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নাট্যচর্চাকে সংগঠিত ও গতিশীল করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ‘বগুড়া নাট্য দল’ নামে আরও একটি নাট্য সংগঠন গড়ে তোলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল নাট্যচর্চাকে কেবল মঞ্চনির্ভর বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

নাটকের নতুন শিল্পী ও কর্মী তৈরিতেও তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। শহীদ টিটু মিলনায়তনে বগুড়া নাট্য দলের কার্যালয়ে নিয়মিত নাটকের ক্লাস নিতেন। নতুন প্রজন্মকে অভিনয়, মঞ্চশিল্প ও নাট্যচর্চায় উৎসাহিত করতেন। তাঁর হাত ধরে অনেকেই নাট্যাঙ্গনে প্রবেশের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।

তাঁর কাছে নাটক ছিল শুধু বিনোদন নয়; নাটক ছিল সমাজকে দেখা, মানুষকে বোঝা, অসংগতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানুষের বিবেককে জাগ্রত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

সর্বশেষ ২০১৩ সালে ‘খারিজ’ নাটকে অভিনয় করেন তিনি। জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত মঞ্চের সঙ্গে তাঁর এই আত্মিক সম্পর্ক অটুট ছিল।

সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও শ্যামল ভট্টাচার্যের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। বগুড়ার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে তিনি আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন।

বিশেষ করে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম বাঙালি শহীদ বগুড়ার সন্তান প্রফুল্ল চাকীর স্মৃতি সংরক্ষণে ‘প্রফুল্ল চাকী স্মৃতি সংসদ’ এবং ‘কবি রোস্তম আলী কর্ণপুরী সংসদ’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল গভীর।

ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অন্তরের। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে সমাজ নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করতে জানে না, সেই সমাজের শিকড় দুর্বল হয়ে পড়ে।

ব্যক্তিজীবন ও মানবিকতা

ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। পরিবার-পরিজনের পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর দায়িত্ববোধ।

জীবনের শেষ অধ্যায়েও মানবকল্যাণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তিনি। মৃত্যুর পর চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য নিজের দেহ দান করে যান। নিজের জীবনাবসানের পরও যেন মানুষের উপকারে আসতে পারেন—এই মহৎ চিন্তা তাঁর উদার, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক মানসিকতারই পরিচয় বহন করে।

জীবনাবসান ও স্মৃতির অমরত্ব

২০২০ সালের ৪ নভেম্বর এই গুণী শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক সংগঠকের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর প্রয়াণে বগুড়া হারায় শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ অভিভাবককে।

কিন্তু মানুষের প্রকৃত মৃত্যু কি কেবল দেহের অবসানেই ঘটে? যাঁরা তাঁদের কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, যাঁরা পরবর্তী প্রজন্মের চিন্তা ও মননে আলো জ্বালিয়ে যান, তাঁদের কি কখনো বিস্মৃত হওয়া যায়?

শ্যামল রঞ্জন ভট্টাচার্য তেমনই একজন মানুষ। তিনি হয়তো আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর হাতে গড়া শিক্ষার্থী, তাঁর নাট্যচর্চার উত্তরসূরি, তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এবং বগুড়ার শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে তাঁর অবদান তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে অনন্তকাল।

বগুড়ার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা এই মানুষটি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই শ্যামল বাংলার এক শ্যামল আলোকবর্তিকা।

শ্রদ্ধেয় শ্যামল ভট্টাচার্য, আপনার প্রয়াণে একটি নক্ষত্রের আলো নিভে গেছে, কিন্তু আপনার রেখে যাওয়া আলোর পথ কখনো নিভে যাওয়ার নয়।

আপনার কর্ম, আদর্শ, জ্ঞানচর্চা ও মানবিকতার উত্তরাধিকার বেঁচে থাকুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।