বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাজা প্রদান নিয়ে এইচআরডব্লিউর উদ্বেগ

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীকে অন্যায্যভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই সংস্থাটি বুধবার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শিক্ষাঙ্গনে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এইচআরডব্লিউ স্পষ্ট করে বলেছে, কেবল শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাস বা মতাদর্শের কারণে কাউকেই শাস্তি দেওয়া যাবে না। উপযুক্ত ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নেওয়া যেকোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এই ধরনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত নিরপেক্ষ মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার মৌলিক স্বাধীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সংস্থাটির মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক চিন্তাধারা নিয়ন্ত্রণের এই প্রয়াস মূলত অতীতের দখলদারিত্ব ও প্রশাসনিক দমন-পীড়নেরই একধরনের পুনরাবৃত্তি।

সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি জানান, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবাধ রাজনৈতিক আলোচনা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার একটি সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। এই ধরনের আলোচনা ও মতভেদকে ভয় পাওয়ার কথা কেবল স্বৈরাচারী শাসকদের, শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলনের মুখে গঠিত কোনো সরকারের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিগত সময়ের ভয়ভীতি ও নিপীড়নের অধ্যায় পেছনে ফেলে বাংলাদেশের এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। রাষ্ট্রক্ষমতা বা রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসলেও অতীতের সেই চেনা দমন-পীড়নের চক্র যেন ঘুরেফিরে না আসে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

এইচআরডব্লিউর বিশদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে হরেক রকমের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী চাকরিচ্যুতি, সাময়িক বরখাস্ত এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে নিষেধাজ্ঞা জারি। অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মূলত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সহিংসতায় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ মদদ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সমর্থনে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা এবং ধর্মীয় পোশাক পরিহিত শিক্ষার্থীদের সাথে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সমর্থক বা যুক্ত থাকার অভিযোগে শত শত শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ বাতিল এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা তাদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য যাচাইয়ে এইচআরডব্লিউ দেশের ২০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক চিঠি পর্যালোচনা করেছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সশরীরে সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং গণমাধ্যমে প্রচারিত টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি আরও বলেন, পূর্ববর্তী সরকারকে সমর্থন করার অজুহাতে কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা প্রমাণ করবে যে দেশে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা এখনো সুরক্ষিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রগতিশীল স্থান হওয়া উচিত, যেখানে সবাই নির্ভয়ে নিজ নিজ চিন্তাধারা ব্যক্ত করতে পারবেন এবং সেখানে বর্তমান প্রশাসন বা সরকারকে সমর্থন করতে কাউকে কোনোভাবেই বাধ্য করা যাবে না।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।