নিহত জাহেদ বেপারী আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তাঁর পরিবারের দাবি, তিনি মুন্সিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফয়সাল বিপ্লবের সমর্থক ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের সদস্যদের।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার রাতে জাহেদকে বাড়ি থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। একপর্যায়ে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয় এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়।
পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করে মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। বর্তমানে তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
নিহতের স্ত্রী বেবী বেগম অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত ফরিদ হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য মৃণাল কান্তি দাসের সমর্থক ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তাঁরা বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এলাকায় বিভিন্ন অপতৎপরতা চালিয়ে আসছেন বলে তাঁর দাবি।
বেবী বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহেদ ও ফরিদ অতীতে আওয়ামী লীগের দুই সাবেক সংসদ সদস্যের সমর্থক ছিলেন। রাজনৈতিক অবস্থান ও স্থানীয় আধিপত্যকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধ চলে আসছিল। সেই বিরোধের ধারাবাহিকতায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে বলে পরিবারের ধারণা।
রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি ভিটিহোগলা গ্রামের একটি মাজারের ওরস আয়োজন নিয়েও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছে নিহতের পরিবার। আগামী শুক্রবার ওই ওরস আয়োজনের কথা ছিল। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে জাহেদের বিরোধ তৈরি হয়। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি ওরস আয়োজন নিয়ে বিরোধও হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন পরিবারের সদস্যরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বাবাকে হারিয়ে শোক ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন নিহতের তিন মেয়ে। তাঁদের বড় মেয়ে ফারিয়া আক্তার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘তিন বোনের সামনে আমার বাবাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে। আমরা তিন বোন চিরদিনের জন্য এতিম হয়ে গেলাম। চোখের সামনে বাবাকে কুপিয়ে মারতে দেখেছে আমার প্রতিবন্ধী বোন মারিয়া ও ছোট বোন ইমা। আমরা এই স্মৃতি কীভাবে ভুলব? এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
এদিকে হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তছলিম উদ্দিন জানান, প্রাথমিক তদন্তে পূর্ববিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একাধিক বিষয় সামনে রেখে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ওসি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ফরিদ বেপারীর নাম পাওয়া গেছে। তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আগেও হত্যা ও মাদকসংক্রান্ত মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত হত্যার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ, স্থানীয় দ্বন্দ্ব নাকি মাজারের ওরস আয়োজনকে কেন্দ্র করে বিরোধ—কোন বিষয়টি প্রধান ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে এ বিষয়ে আরও তথ্য জানা যেতে পারে।


