তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ অর্থায়ন কর্মসূচি ‘উদ্যোগ’-এর আওতায় বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা দেওয়ার সুযোগ রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে, আর বাকি ১০ লাখ টাকা পাওয়া যাবে অনুদান হিসেবে। তবে এই সুযোগকে কেন্দ্র করে প্রতারণার চেষ্টা চালাচ্ছে একটি চক্র। ঋণ নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিকাশসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক সতর্কবার্তায় বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, সম্প্রতি তাদের নজরে এসেছে যে, ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির আওতায় ঋণ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। এ কাজে বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের মাধ্যম ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট জানিয়েছে, ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির সব কার্যক্রম স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অর্থ দিলেই ঋণ পাওয়া যাবে, এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই ঋণ অনুমোদন করিয়ে দেওয়া কিংবা অর্থায়ন নিশ্চিত করার নামে কেউ টাকা চাইলে তা থেকে বিরত থাকার জন্য আবেদনকারীদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতারণা এড়াতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ‘উদ্যোগ’ নামে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক ফেসবুক পেজ কিংবা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট নেই। ফলে এ নামে কোনো পেজ বা অ্যাকাউন্ট খুলে ঋণসংক্রান্ত তথ্য প্রচার, আবেদন গ্রহণ কিংবা অর্থ লেনদেনের আহ্বান জানানো হলে বিভ্রান্ত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির নাম ব্যবহার করে ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট তৈরি, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার কিংবা প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত আইনসহ প্রচলিত আইনের আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ লাখ টাকার সুবিধা
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করা, তাঁদের উদ্যোগ চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করা। বিশেষ করে যাঁরা নতুন ব্যবসা শুরু করতে চান, কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি বা জামানতের অভাবে প্রচলিত ব্যাংকঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন, তাঁদের জন্য এ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এই কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে ফেরত দিতে হবে এবং বাকি ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। অর্থাৎ মোট অর্থায়নের অর্ধেক ঋণ এবং অর্ধেক অনুদান। বিনা জামানতে এই সহায়তা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো নতুন উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক আর্থিক বাধা কমানো এবং তাঁদের ব্যবসায়িক উদ্যোগ বাস্তবায়নে উৎসাহিত করা।
কর্মসূচিটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ব্যবসা গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তরুণদের নিজস্ব উদ্যোগে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।
৫৬ জেলার তরুণদের আবেদন গ্রহণ চলছে
এদিকে কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণ করে দেশের অবশিষ্ট ৫৬ জেলার তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আবেদন কার্যক্রম চলবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। ফলে আগ্রহী তরুণ উদ্যোক্তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের আওতায় আনতে এই সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে ব্যবসার নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী তরুণদের জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
তবে অর্থায়নের সুযোগ গ্রহণ করতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়ার নামে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা অপরিচিত ব্যক্তিকে অগ্রিম টাকা দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে সন্দেহজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক বিবরণ কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রতারণামূলক প্রচারণা থেকে দূরে থাকার এবং যাচাই না করে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার আহ্বান জানিয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নেওয়া এই অর্থায়ন কর্মসূচির সুযোগ যেন প্রতারকদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।


