গতকাল শুক্রবার (৬ নভেম্বর) মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ ঘোষণা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সংস্থাটি জানায়, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির আওতায় এই পুরস্কার দেওয়া হবে।
ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা, প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, বিজ্ঞানী, গবেষক এবং এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারলে সর্বোচ্চ ২০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে কোন ধরনের তথ্যের জন্য কত অর্থ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো নির্দেশনা প্রকাশ করেনি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ‘রিওয়ার্ডস ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি চালু করা হয়। এর মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদ, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তথ্যের গুরুত্ব ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে পুরস্কার দেওয়া হয়। পাশাপাশি তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি দেখা দিলে তাঁকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রয়েছে এই কর্মসূচিতে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এই পুরস্কার ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নিরাপত্তাবিষয়ক বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে পালন না করায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর সংস্থাটির নজরদারি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউজ তৈরির প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং সেগুলোর মজুত সম্পর্কে আইএইএ ধারাবাহিকভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন। ফলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থা, এর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ দীর্ঘদিনের। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা একপর্যায়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজনেই এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে বলে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। গতকাল রাতে ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা না চালালে ইসরায়েলের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে পড়ত। তাঁর দাবি, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে দেশটি তা ব্যবহার করত এবং এর পরিণতিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ত।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, আট মাসের সংঘাতে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনা চলছে এবং তেহরান একটি চুক্তি করতে চায়।
তবে যুদ্ধের অবসান এবং নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আলোচনার মাধ্যমে সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও গত মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তাঁর সরকার এখনো কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়েও আলোচনা চলছে।
এর আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানে আরও কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া বাকি রয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স পর্বতও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ওই এলাকায় ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা রয়েছে। তবে তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন পুরস্কার ঘোষণা কেবল গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নয়, বরং দুই দেশের চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একদিকে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে পারমাণবিক স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক আলোচনা, আন্তর্জাতিক পরমাণু নজরদারি এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।


