গত রাতে এ ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে সাইনবোর্ড ভাঙার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে এনসিপির এই কর্মকাণ্ডের তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য আরমা দত্ত।
শনিবার সকালে বাড়িটির উত্তর পাশের দেয়ালে সাইনবোর্ডটি আবারও টানানো অবস্থায় দেখা যায়।
আরমা দত্ত সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বাড়িটি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। সেখানে কী করা হবে, সেটি সংস্কার করা হবে নাকি বিক্রি করা হবে—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পরিবারের রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, গত ৫০ বছরে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি সংরক্ষণে রাষ্ট্র কী উদ্যোগ নিয়েছে?
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র তাদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছে। সরাসরি সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে না পেরে এখন এনসিপিকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
আরমা দত্ত বলেন, কুমিল্লার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই জানেন, বাড়িটি তাদের পরিবারের পৈতৃক সম্পত্তি। এ বিষয়ে পরিবারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু রাতের আঁধারে আইনগতভাবে স্থাপন করা একটি সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ঘটনাটিকে তিনি দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি বহুদিনের। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে আলোচনা ও দাবি উঠলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। সময়ের সঙ্গে বাড়িটির মূল স্থাপনারও অবনতি ঘটেছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে বাড়িটির মূল স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
সম্প্রতি উত্তরাধিকার সূত্রে বাড়িটির মালিকানা দাবি করে সেখানে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন আরমা দত্ত। তিনি ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জীব দত্তের মেয়ে।
অন্যদিকে, এনসিপির নেতারা বলছেন, ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রি বা অন্য কোনোভাবে এর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তারা সাইনবোর্ডটি সরিয়ে দিয়েছেন। তাদের দাবি, বাড়িটি কেবল একটি পরিবারের সম্পত্তি নয়; বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও এর গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
এনসিপির কুমিল্লা মহানগর কমিটির সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গত রাতে দলটির অবস্থান তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
বাড়িটি রক্ষায় দ্রুত উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জমা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে এনসিপি।
সাইনবোর্ড ভাঙার বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ঐতিহাসিক বাড়িটি রক্ষার উদ্দেশ্যেই তারা সাইনবোর্ডটি ভেঙেছেন। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য তাদের নেই। বাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়ে সরকার এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে আরমা দত্তের সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেন তিনি।
কাওসার আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাড়ির জমি বিক্রি কিংবা সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের চেষ্টা করা হলে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।
এদিকে, ঘটনাটি নিয়ে আইনগত পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, এ ঘটনায় অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি ঘিরে সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা সংরক্ষণে রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তির মালিকানা ও সংরক্ষণের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা সম্ভব। একদিকে বাড়িটি সংরক্ষণ করে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি, অন্যদিকে উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তির অধিকার—দুই বিষয়ই এখন আলোচনায় এসেছে।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে আটক করে। এরপর তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল।
তাঁর মতো জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণের দাবি নতুন নয়। তবে সেটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মালিকানা, আইনি অধিকার এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে উঠেছে।


