বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈনুদ্দিন খান বাদল: আপোষহীন এক রাজনীতিবিদের নাম

বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের পরিচয় কেবল দলীয় পদ-পদবি কিংবা সংসদ সদস্যের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজপথের সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের সাহসিকতা, আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা এবং সংসদে যুক্তিনির্ভর বলিষ্ঠ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তাঁরা নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈনুদ্দিন খান বাদল ছিলেন তেমনই একজন ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ।

প্রখ্যাত জাসদ নেতা মঈনুদ্দিন খান বাদল ছিলেন রাজপথের এক লড়াকু সৈনিক, অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা, কারাবরণ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি নিজের আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল স্পষ্টবাদিতা, সাহসিকতা এবং আপসহীন মনোভাব।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত দিনে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মঈনুদ্দিন খান বাদল। তাঁর পিতা আহমদ উল্লাহ খান এবং মাতা যতুমা খাতুন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ধারায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাঁর সাহসী ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য অস্ত্রবাহী জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে অস্ত্র খালাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অন্যতম সংগঠক ও নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য তাঁর সেই সাহসী ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

স্বাধীনতার পর তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে বাসদের সঙ্গেও যুক্ত হন। সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলে রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।

রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন একজন অভিজ্ঞ সংগঠক, দক্ষ বক্তা এবং প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে টানা তিনবার জাতীয় সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন।

সংসদে তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। যুক্তি, তথ্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সমন্বয়ে তাঁর বক্তব্য সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলত। সংসদীয় বিতর্কে তাঁর বলিষ্ঠ উচ্চারণ, সাবলীল বাগ্মিতা এবং স্পষ্টবাদী অবস্থানের কারণে তিনি একজন ঝানু পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে বিশেষ পরিচিতি অর্জন করেছিলেন।

বিশেষ করে দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব, গণতন্ত্রের সংকট এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি দলীয় অবস্থানের বাইরেও নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে দ্বিধা করতেন না। এমনকি নিজ দল সরকারে থাকাকালেও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে তাঁকে দেখা গেছে। এখানেই ছিল তাঁর রাজনৈতিক সাহসিকতা ও স্বকীয়তা।

জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট গঠন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর ভারতের বেঙ্গালুরুর নারায়ণ ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬৭ বছর বয়সে এই সংগ্রামী রাজনীতিবিদ শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা, অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য, স্পষ্টভাষী বক্তা ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবসান ঘটে।

মঈনুদ্দিন খান বাদল কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক সময়ের প্রতিনিধি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় তাঁর অবদান তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।

মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁর কর্ম, আদর্শ, সাহসী উচ্চারণ ও সংগ্রামের ইতিহাস থেকে যায়। মঈনুদ্দিন খান বাদলও তেমনই এক নাম—যাঁর রাজনৈতিক জীবন আগামী প্রজন্মের কাছে সাহস, প্রতিবাদ ও আদর্শিক দৃঢ়তার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের এই অকুতোভয় সৈনিক, আপসহীন রাজনীতিবিদ ও বলিষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান মঈনুদ্দিন খান বাদলকে।

বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

খবরওয়ালা একটি বিশ্বস্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যেখানে বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও আপডেট প্রকাশ করা হয়। রাজনীতি, জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ, শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, বিনোদন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে পাঠকদের জন্য রয়েছে নির্ভরযোগ্য ও সময়োপযোগী সংবাদ পরিবেশন।

© ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।