সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণ, প্রাণনাশের হুমকি এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত অবমাননার অভিযোগে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নোটিশে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককেও নোটিশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসান শাহরিয়ার এই আইনি নোটিশ পাঠান। এতে পরীমণিকে নোটিশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে লিখিতভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে পরবর্তী সময়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও বলা হয়েছে, চলচ্চিত্র, ভিডিও কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে অশ্লীল কথাবার্তা, হুমকি, কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি এবং নগ্ন বা অশালীন নাচ-গানের মতো কর্মকাণ্ড থেকে পরীমণিকে ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। নোটিশে এসব কর্মকাণ্ডের কোনো শৈল্পিক বা শিক্ষামূলক মূল্য নেই বলেও দাবি করা হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আগামী সাত দিনের মধ্যে পরীমণির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
আইনি নোটিশে গত ৫ নভেম্বরের একটি ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। ওই দিন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান শামসুন্নাহার স্মৃতি, যিনি পরীমণি নামে পরিচিত। নোটিশের বিবরণ অনুযায়ী, সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে গাড়ি থেকে নেমে আদালতের এজলাসের দিকে যাওয়ার সময় সাংবাদিকেরা তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে চাইলে তার নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের ধাক্কাধাক্কি হয়।
এ সময় পরীমণি দৈনিক সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইনের মোবাইল ফোন কেড়ে নেন বলে নোটিশে অভিযোগ করা হয়েছে। একই ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা নিরাপত্তারক্ষীরা রবিউলের ভিডিও ধারণের ট্রাইপড ভেঙে ফেলেন বলেও উল্লেখ রয়েছে।
ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন জাগো নিউজের প্রতিবেদক আশিকুজ্জামান ও মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার আবদুল্লাহ আল কাউছার, আগামীর সময়ের প্রতিবেদক সিয়াম হোসেন এবং টাইমস টুডের শাহ রিয়াজ। এ ছাড়া সুজন চন্দ্র মণি দাস নামের একজন বিচারপ্রার্থীর মাথা ফেটে রক্তপাতের ঘটনাও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
আদালত প্রাঙ্গণে এমন পরিস্থিতি তৈরির বিষয়ে নোটিশে বলা হয়েছে, সেখানে উপস্থিত বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব। ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে পেশিশক্তি প্রদর্শন কিংবা আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের অধিকার কারও নেই।
নোটিশে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আদালতের কার্যক্রম শেষে বের হওয়ার সময় পরীমণি সাংবাদিক রবিউল হোসাইনের দিকে তেড়ে যান। রবিউলের ডান হাত জন্মগতভাবে বিকলাঙ্গ; তার বাঁ হাতের তুলনায় ডান হাত ছোট এবং তিনটি আঙুল নেই। ওই সময় পরীমণি তাকে উদ্দেশ করে ‘এদিকে আয়, আমার হাত এভাবে ধরলি কেন?’ বলে গালিগালাজ করেন এবং ‘তোকে পিষে মেরে ফেলব’ বলে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেন বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটির ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
আইনজীবীর নোটিশে বলা হয়েছে, একজন পেশাদার সাংবাদিকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ শুধু তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদার ওপর আঘাত নয়, স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যমের কাজের পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক। একজন পরিচিত চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয় বলেও নোটিশে মন্তব্য করা হয়েছে।
এদিকে, পরীমণির বিরুদ্ধে জাতীয় সংগীত অবমাননার অভিযোগও আনা হয়েছে। নোটিশ অনুযায়ী, গত ৬ নভেম্বর তিনি তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতকে মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করে একটি অশালীন পোস্ট প্রকাশ করেন। বিষয়টি নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে আইনি নোটিশে।
এসব ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। নেটিজেনদের একটি অংশ পরীমণির আচরণের সমালোচনা করছেন। তবে আইনি নোটিশে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরীমণির বক্তব্য বা তার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, তা মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
নোটিশে নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে ক্ষমা চাওয়া এবং শিল্পী সমিতির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যথায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নোটিশদাতা আইনজীবী।


