খবরওয়ালা অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ মে ২০২৫
‘তোরা আমার বাবার কাছে নিয়ে যা, আমি বাবাকে একটু ছুঁয়ে দেখি। কী অভিমানে বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গেল।’ কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রামে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার র্যাব কর্মকর্তা পলাশ সাহার (৩৭) মা আরতী সাহা। ছেলের কপালে চুমু খেয়ে প্রলাপ করছিলেন সন্তান হারা মা। সন্তানের শোকে তার চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে।
এর আগে র্যাব-৬ এর কমান্ডিং কর্মকর্তা কমান্ডার শাহাদাত হোসেনের নেতৃত্বে লাশবাহী ফ্রিজারে করে নিহত পলাশের লাশ গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার তারাশী গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে বেলা পৌনে ১০ টার দিকে।
তাকে দেখতে সহপাঠী, প্রতিবেশি ও স্বজনরা ওই বাড়িতে ভিড় করে। এ সময় ওই বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনের কান্নায় ও আহাজারিতে শোকাবহ হয়ে ওঠে সাহা বাড়ির পরিবেশ।
গোপালগঞ্জ পয়সারহাট সড়কে কোটালীপাড়ার তাড়াশি বাসস্ট্যান্ড থেকে ৫০০ মিটার দক্ষিণে পলাশ সাহার বাড়ি। মেঝে পাকা চারচালা টিনের ঘরের সামনে বসে আর্তনাদ করে স্মৃতিচারণ করছেন বড় বোন রমা সাহা। পাশে মেজো ভাই নন্দলাল সাহা ও বড় ভাই লিটন সাহার স্ত্রী পাশে বসে আর্তনাদ করছিলেন।
বেলা সাড়ে দশটা পর্যন্ত ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পর শেষকৃত্যের জন্য পলাশের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় পৌরসভার পাড়কোনা মহাশ্মশানে। সেখানে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান এবং ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে দুপুরে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
নিহত পলাশের মেজ ভাই নন্দলাল সাহা বলেন, তিন ভাই এক বোনের মধ্যে পলাশ ছিলেন সবার ছোট ও আদরের। কোটালীপাড়া থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। সাব–রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে চাকরি দিয়ে জীবন শুরু। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক, ৩৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডার ও ৩৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ পায়। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশে দায়িত্ব পালন করে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর তাঁকে র্যাবে পাঠানো হয়।
দুই বছর আগে ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ড–সংলগ্ন চৌধুরীপাড়ার সুস্মিতা সাহার সঙ্গে বিয়ে হয় পলাশের। বিয়ের দুই মাস পর থেকে সংসারে নানা অশান্তি শুরু হয় বলে জানান নন্দলাল সাহা।
গতকাল দুপুরে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে র্যাব–৭ ক্যাম্পে অভিযানের প্রস্তুতি চলছিল। এ জন্য নিজের কক্ষে যান পলাশ সাহা। তখন সহকর্মীরা গুলির শব্দ শুনে ছুটে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে দেখতে পান। তাঁর রক্তাক্ত মরদেহের পাশে একটি চিরকুট পড়ে ছিল। এতে তাঁর মৃত্যুর জন্য নিজেই দায়ী বলে উল্লেখ করেন।
চিরকুটে লেখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর জন্য মা এবং বউ কেউ দায়ী না। আমিই দায়ী। কাউকে ভালো রাখতে পারলাম না। বউ যেন সব স্বর্ণ নিয়ে যায় এবং ভালো থাকে। মায়ের দায়িত্ব দুই ভাইয়ের ওপর। তাঁরা যেন মাকে ভালো রাখে। স্বর্ণ বাদে যা আছে, তা মায়ের জন্য। দিদি যেন কো–অর্ডিনেট করে।’
পলাশের বাল্যবন্ধু আরিফ হোসেন বলেন, ‘পলাশ আমার বাল্যবন্ধু। লেখাপড়ায় অত্যন্ত মেধাবী ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে মেলামেশা করত। তার অকালমৃত্যু আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
খবরওয়ালা/এসআর