এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৫, ২:৪৭ এএম
সন্তান আল্লাহর দেয়া অশেষ রহমতের প্রতীক। তিনি এই পৃথিবীতে বাবা-মায়ের কাছে সন্তানকে শুধু দায়িত্ব হিসেবেই দেননি, দিয়েছেন আশীর্বাদ হিসেবে।
সন্তানের আগমনে একটি পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে যায়। একটি নিষ্পাপ মুখ, কচি হাসি, দৌড়ঝাঁপ, কান্না-আবদার-সব মিলিয়ে সন্তান যেন জীবনের এক নতুন অর্থ নিয়ে আসে।
প্রতিটি বাবা-মা তাঁর সন্তানকে মানুষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। জীবনের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে, নিজের স্বপ্নগুলোকে পেছনে ফেলে তারা সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। তাদের সন্তান যেন হয় একজন সুশিক্ষিত, সৎ, বিনয়ী, মানবিক ও আদর্শবান মানুষ। যেন সমাজে সে সম্মান পায়, নিজের পরিবারের জন্য হয় গর্বের কারণ। যেন নিজের জীবন গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যতে সুখী ও শান্তিপূর্ণ একটি পরিবার গড়তে সক্ষম হয়। এই নিঃস্বার্থ চাওয়া পূরণে বাবা-মায়ের চেষ্টার কোনো ঘাটতি থাকে না।
কিন্তু, আমাদের সমাজ দিন দিন এক অদ্ভুত রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন ও আধুনিকতার জোয়ারে আমাদের পারিবারিক কাঠামোতে ভয়ানক পরিবর্তন এসেছে। একান্নবর্তী পরিবারগুলো আজ ইতিহাস। পারস্পরিক সহানুভূতি, শ্রদ্ধা, সহনশীলতা-এসব মানবিক গুণগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিকতার নামে আমাদের মাঝে ঢুকেছে এক ধরনের উগ্রতা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
আজকের অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা নিজের সন্তানকে ঠিকমতো সময় দিতে পারছেন না। বরং তাঁরা অন্যের সন্তানকে নিয়ে সমালোচনায় ব্যস্ত। কোনো ছেলে-মেয়ে একটু এগিয়ে গেলে, ভালো কিছু অর্জন করলে, তাদের প্রশংসা না করে তার পেছনে কী আছে, কার সাহায্যে হয়েছে, কেমনভাবে হয়েছে-এসব খুঁজে গিবত ও হিংসা ছড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকে। অনেক সময় এই নেতিবাচক মনোভাব সন্তানদের মাঝেও ছড়িয়ে দেন বা পড়ে, যা অত্যন্ত ক্ষতিকর সন্তান ও সমাজের জন্য।
এই সমাজে আমরা নিজের অজান্তেই হিংসা, বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতা সন্তানদের মনোজগতে ঢুকিয়ে দিচ্ছি। অন্যের সমালোচনা করতে করতে নিজের সন্তানদের মধ্যেও সেই নেতিবাচক মানসিকতা ঢুকিয়ে দিচ্ছি। তারা হয়ে উঠছে বিদ্বেষী, অহংকারী ও অশ্রদ্ধাশীল। আদর্শহীনতার এই প্রবণতা তাদের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ উভয়কেই বিপন্ন করছে। অথচ আমরা বুঝতে পারি না, যে-সব বিদ্বেষ, অভিযোগ, গিবত আমরা মুখে বলছি, তা এক সময় আমাদের সন্তানের মূল্যবোধকে গিলে খায়।
আমাদের পূর্বপুরুষদের দিকে তাকালেই দেখা যায়, তাঁরা হয়ত উচ্চশিক্ষিত ছিলেন না, কিন্তু জীবনের শিক্ষা তাঁরা হৃদয়ে ধারণ করতেন। আমাদের মায়েরা আটপৌরে জীবনে থেকেও ছিলেন অসামান্য। তাঁদের চোখে-মুখে ছিল কোমলতা, মুখে ছিল সদা হাসি, অন্তরে ছিল পরিশুদ্ধ মমতা ও মানবিকতা । তাঁরা শিখিয়েছেন কীভাবে নম্র হতে হয়, ছোট হয়ে থাকতে হয়, মানুষকে শ্রদ্ধা করতে হয়, ও ছোটদের স্নেহ করতে ও ভালোবাসতে হয়।
আজ আমাদের সকলের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন-নিজ সন্তানদের চরিত্র গঠনে মনোযোগ দেওয়া। তাদের কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, নৈতিক শিক্ষা, মানবিকতা, আদর্শ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সহনশীলতা শেখানো। আমরা যদি প্রতিটি পরিবারে এই চর্চা চালু করি-যেখানে বাবা-মা নিজেরাই উদাহরণ হন, হিংসা নয় বরং সহযোগিতার বাতাবরণ তৈরি করেন—তাহলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেমন উজ্জ্বল হবে, তেমনি সমাজও হবে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ।
আসুন, আমরা সবাই আগে নিজের সন্তানদের নিয়ে ভাবি।
তাদের কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি, কোন পরিবেশে রাখছি, কোন মূল্যবোধে বড় করছি—তা নিয়ে সচেতন হই। অন্যের সন্তানকে নিয়ে সমালোচনা না করে নিজের সন্তানের গঠনমুখী ভবিষ্যতের দিকেই নজর দিই। কারণ, এই সন্তানরাই আগামী প্রজন্মের পথপ্রদর্শক।
আল্লাহ্ যেন আমাদের সকল সন্তানকে করেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত, আদর্শ ও মানবিক গুণে গুণান্বিত।
তাদের জীবন হোক সফল, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দময়।
তারা হোক বড় মনের, সহনশীল হৃদয়ের এবং সৎ চরিত্রের অধিকারী।
আমাদের পরিবার হোক বন্ধন পূর্ণবন্ধন পূর্ণ
লেখক – সম্পাদক ও প্রকাশক ” খবরওয়ালা ”
মন্তব্য